ইতিহাসের সাক্ষী: কিউবাতে ক্ষমতায় ফিদেল কাস্ত্রো

উনিশশ' উনষাট সালের জানুয়ারি মাসে কিউবায় অবসান ঘটেছিল মার্কিন সমর্থিত স্বৈরশাসক ফুলহেনসিও বাতিস্তার কয়েক দশকব্যাপি শাসনের - রাজধানী হাভানায় ঢুকেছিল বামপন্থী বিপ্লবীদের দল।

সেই ঘটনার একজন প্রত্যক্বদর্শী কার্লোস আলজুগেরাই। "এখানে তখন শত শত কিউবান জড়ো হয়েছিল - তারা সবাই স্বাগত জানাচ্ছিল ফিদেল কাস্ত্রোকে।"

"হাভানার এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল সারি সারি জীপ, ট্রাক আর ট্যাংক। ফিদেল কাস্ত্রো নিজেও ছিলেন একটি ট্যাংকের ওপর। তার সাথে ছিলেন অন্য বিদ্রোহী নেতারা, কমান্ডাররা।"

"লোকজন হাততালি দিচ্ছিল। শ্লোগান দিচ্ছিল - 'বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক'।"

বিজয়ীর বেশে কাস্ত্রোর হাভানায় প্রবেশ তাই ছিল কিউবার জন্য এক নতুন যুগের সূচনা। আর ফ্লোরিডা প্রণালীর ওপারে শক্তিধর প্রতিবেশী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিউবার সম্পর্কে এই দিন থেকেই চিড় ধরতে শুরু করে।

কার্লোস তখন স্কুলে পড়েন, তার বয়েস তখন ১৫। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন বিপ্লব-পূর্ব কিউবাতে উচ্চবিত্ত পরিবারে, তাই প্রাচুর্যের মধ্যেই বড় হয়েছিলেন তিনি।

তার পড়াশোনা একটি বেসরকারি জেসুউট স্কুলে। তার শনি-রবিবারগুলো কাটতো হাভানার কান্ট্রি ক্লাবে বা টেনিস ক্লাবে - যেখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল না।

জেনারেল বাতিস্তা কিউবায় ক্ষমতা দখল করেছিলেন ১৯৫২ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। কিউবার উচ্চবিত্ত এলিট শ্রেণীর খুবই প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি।

"আমার মনে আছে আমার অনেক বন্ধুর বাবাই সরকারের সাথে নানা ধরণের ব্যবসায় জড়িত ছিল। তারা অনেক টাকাকড়ি বানিয়েছিল, এবং এ জন্য তারা খুশিও ছিল।ঃ

কিন্তু বাতিস্তার লোকেরা আন্দোলনরত শ্রমিক এবং কৃষকদের ওপর নানাভাবে নিপীড়ন চালাতো। বাতিস্তা আরো যেটা করেছিলেন তা হলো আমেরিকান মাফিয়াদের সুযোগ দিয়েছিলেন কিউবাকে ধনী এবং ক্ষমতাবানদের একটা অবাধ স্বর্গরাজ্যে পরিণত করার।

fidel castro

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, ফিদেল কাস্ত্রো

কার্লোসের বাবা এবং পিতামহ উভয়েই ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ। তারা ছিলেন বাতিস্তার শাসনের বিরোধী - যা ক্রমশই নিপীড়নমূলক এবং দুর্নীতবাজ হয়ে উঠছিল।

১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে কিউবায় শান্তিপূর্ণ সরকারবিরোধী বিক্ষোভগুলো ধীরে ধীরে আরো উগ্র হয়ে উঠতে শুরু করলো, কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্ত সশস্ত্র তৎপরতাও দেখা গেল।

সে সময় ফিদেল কাস্ত্রো কিছুদিন জেল খাটার পর নির্বাসনে চলে গিয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালের শেষের দিকে তিনি গোপনে কিউবায় ফিরে এলেন। তিনি কিউবার পূর্বাঞ্চলের দুর্গম পার্বত্য এলাকা সিয়েরা মায়েস্ত্রায় একটি ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করলেন।

এখান থেকেই ফিদেল কাস্ত্রো, তার ভাই রাউল এবং আর্জেটিনিয়ান আরনেস্তো চে গেভারা শুরু করলেন বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করলেন।

১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাস্ত্রোর গেরিলারা বড় ধরণের সাফল্য পেলো। শহরগুলোতে তাদের যে সমর্থকরা ছিল তারা সারা দেশকে অচল করে দিলো। সামরিক বাহিনীতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাতিস্তার যে গুরুত্বপূর্ন মিত্ররা ছিল - তারা তার পক্ষ ত্যাগ করতে শুরু করলো।

কার্লোস বলছিলেন, "ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ রাতে আমরা বেশ আগেভাগেই ঘুমাতে চলে গেলাম। মাঝরাতে নতুন বছর শুরুর সময়টার জন্য অপেক্ষা করি নি।

"বোধ হয় ভোর তিনটে বা চারটের দিকে শুনলাম ফোনটা বাজছে। আমার বাবা জেগে উঠে ফোনটা ধরলেন। তার পর আমাদের সবার দিকে ফিরে বললেন: 'বাতিস্তা পালিয়ে গেছে'।"

বাতিস্তা পালিয়ে ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রে চলে যাবার খবর ছড়ানোর পর শুরু হলো জনতার উল্লাস, পাশাপাশি অরাজকতা, লুটতরাজ।

fidel castro

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, ফিদেল কাস্ত্রো, পাশে চিলির অগুস্ত পিনোশে

বিদ্রোহী যোদ্ধার হাভানা শহরে ঢুকে দা্ঙ্গা থামাতে সামরিক শাসন জারি করলো। হাভানার সামরিক স্থাপনাগুলো বিদ্রোহীযোদ্ধাদের দখলে চলে গেল অতি সহজেই - একটি গুলিও খরচ করতে হলো না। সরকারি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করলো।

ফিদেল কাস্ত্রো রাজধানী হাভানায় এলেন ১৯৫৯ সালের জানুয়ারির আট তারিখে। তিনি দ্রুত রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিলেন। দেশের কৃষি ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হলো। প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো নির্বাচনের।

কার্লোসের মনে আছে সেটা একটা মিশ্র অনুভুতিতে ভরা উত্তেজনাপূর্ণ সময় ছিল।

"আমি ছিলাম এমন একটা শ্রেণীর লোক যেখানে লোকেরা এসব পরিবর্তন নিয়ে খুব ভয়ের মধ্যে ছিল। আমার কিছু বন্ধু বিপ্লবের সমালোচনা করতে শুরু করলেন এই বলে যে এরা বেশি বাড়াবাড়ি করছে।"

"ফলে যেটা হলো, ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে আমার স্কুলের সব বন্ধু , আমার সব মামা-খালা, চাচা-ফুপুরা এবং তাদের ছেলে-মেয়েরা - অর্থাৎ আমার সব সম্পর্কীয় ভাইবোনরা - দেশ ছেড়ে চলে গেলেন।"

কার্লোস এবং তার বাবা-মা কিউবা ছেড়ে যান নি। কিন্তু কাস্ত্রো কিউবাকে যে দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন তা নিয়ে তাদের গভীর ভিন্নমত ছিল।

১৯৬১ সাল নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিউবার কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে গেল। সেই দ্বীপে আমেরিকানদের যত সম্পত্তি ছিল তা বাজেয়াপ্ত করা হলো। কমিউনিস্ট কিউবা খোলাখুলিভাবেই সোভিয়েত শিবিরে সামিল হলো।

কার্লোস পরে একজন কূটনীতিক হয়েছিলেন। সমালোচনা থাকলেও তিনি ৬০ বছর পরেও কাস্ত্রোর বিপ্লবের একজন সমর্থক।

তিনি বলেন, "কিউবায় বিপ্লব অনিবার্য ছিল। কিন্তু এটা যতটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন করতে চেয়েছিল - তা খুব বেশি দূর চলে গিয়েছিল, অতিবিপ্লবী হয়ে গিয়েছিল।"

"কিন্তু এটা ছিল একটা প্রতিক্রিয়া - কারণ কিউবার উচ্চবিত্ত শ্রেণী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একসাথে মিলে এই বিপ্লব ঠেকাতে চেয়েছিল এবং কাস্ত্রোর সরকারকে উৎখাত করতে চেয়েছিল।"

ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বটি পরিবেশন করেছেন পুলক গুপ্ত।