ইতিহাসের সাক্ষী
উনিশশ' একাশি সালের অক্টোবর মাসে কায়রোতে এক সামরিক প্যারেড পরিদর্শনের সময় কিছু সামরিক অফিসারের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন মিশরেরর প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত।
সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তার স্ত্রী জিহান সাদাত - যিনি পরে বলেছেন, তার মনে সব সময়ই এ ভাবনা কাজ করতো যে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তিকারী প্রথম আরব নেতা আনোয়ার সাদাতকে যে কোন সময় হত্যা করা হতে পারে।
ইতিহাসের সাক্ষীর এবারের পর্বে বিবিসির লু্সি হিদালগোর কাছে সেদিনের স্মৃতি বর্ণনা করেছেন জিহান সাদাত, যা পরিবেশন করেছেন পুলক গুপ্ত।
জিহান সাদাত বলছিলেন, "যেদিন আমার স্বামী ইসরাইল সফরে যাবার এবং তাদের সাথে শান্তি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিলেন- সেদিন থেকেই আমি জানতাম যে এ জন্য তাকে হত্যা করা হবে।"
ঠিক তাই ঘটলো ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাসের ৬ তারিখ । মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে কায়রোর একটি সামরিক প্যারেডে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই সামরিক প্যারেডের আয়োজন করা হয়েছিল ইসরাইলের সাথে মিশরের শেষ যুদ্ধের স্মারক অনুষ্ঠান হিসেবে। তাতে উপস্থিত ছিলেন আনোয়ার সাদাতের স্ত্রী জিহান সাদাতও।

এই ৬ই অক্টোবর দিনটি আনোয়ার সাদাতের খুব প্রিয় একটি দিন ছিল।
"সেদিন আমি তাকে বলেছিলাম বুলেট প্রুফ ভেস্ট পরে যেতে। তিনি আমার কথা শোনেন নি। বলেছিলেন, যদি গুলি আমার মাথায় লাগে তাহলে? সেজন্য কি আমার মাথাতেও কিছু পরে থাকতে হবে। তিনি কখনো নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে কেয়ার করতেন না। তিনি বললেন, বুলেটপ্রুফ পোশাকের দরকার নেই। ওসব ছাড়াই তিনি রওনা হলেন।"
প্যারেডের সবারই দৃষ্টি যখন বিমান মহড়ার দিকে - তখনই দুটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটলো।
"আমার দেহরক্ষী আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো - কারণ তখন আমাদের দিকে বুলেটগুলো ছুটে আসছে। যখন গুলিবর্ষণ থামলো তখন আমি কি হয়েছে তা দেখতে ছুটে গেলাম। আমি আনোয়ার সাদাতকে দেখতে পেলাম না। শেষ আমি তাকে দেখেছিলাম, যখন তিনি সালাম নেবার জন্য উঠে দাড়িয়েছিলেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন ওই সৈন্যরা তাকে সালাম দেবার জন্য আসছে। কিন্তু হয়তো এটাও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তারা হত্যা করতে আসছে, কারণ তিনি সেসময় ঘুরে দাঁড়িয়ে তার দেহরক্ষীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলছিলেন।"
"আনোয়ার সাদাত নিহত হবার সময় জিহানের বয়স ছিল ৪৬। আর যখন তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল তখন তার বয়েস ছিল মাত্র ১৫। আনোয়ার সাদাত তখন সেনাবাহিনীতে ছিলেন, এবং তিনি ছিলেন মিশরের আরেক নেতা গামাল আবদেল নাসেরের বন্ধু - যিনি মিশরের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছিলেন। মিশরে ব্রিটিশ প্রভাবের বিরোধিতা করার জন্য তিনি কিছুদিন জেলেও ছিলেন।

ছবির উৎস, unk
"প্রথমবার তিনি যখন জেল থেকে ছাড়া পেলেন, তিনি সরাসরি আমার এক সম্পর্কীয় বোনের স্বামীর বাড়িতে এলেন। তিনি ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এবং তার বাড়িতেই আনোয়ার সাদাত থাকতে এসেছিলেন। এখানেই তার সাথে আমার দেখা হয়। তিনি আমার ১৫তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও এসেছিলেন। তিনি বললেন, আমার সাথে কোন টাকা নেই, দেবার মতো কোন জিনিসও নেই। কিন্তু আমি তোমাকে একটা গান উপহার দেবো। বলে তিনি গাইতে শুরু করলেন। তার পর আমরা কথা বললাম । তিনি ছিলেন দেশের জন্য - মিশরের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এবং সেটাই আমাকে তার প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। তার কোন পরিবর্তন হয় নি। প্রথম পরিচয়ের দিন থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি একই রকম ছিলেন।"
আনোয়ার সাদাত ও জিহান বিয়ে করেন ১৯৪৯ সালে। ২১ বছর পর প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের মৃত্যুর পর ১৯৭০ সালে মিশরের নতুন প্রেসিডেন্ট হলেন আনোার সাদাত।
সাদাত পেসিডেন্ট হবার কিছুদিন পরই মিশরের সাথে ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হয়। ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্মের পর সেটা ছিল তৃতীয় আরব ইসরাইল যুদ্ধ। মিশর সে যুদ্ধে জয়লাভ না করলেও পরাজিতও হয় নি। কিন্তু ১৯৭৩ সালের সেই যুদ্ধের চার বছর পর আনোয়ার সাদাত এমন এক কাজ করলেন তা কেউ আগে সম্ভব বলে মনে করতেন না।
তিনি ঘোষণা করলেন, তিনি ইসরাইল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবেন এবং শুধু তাই নয় শান্তি স্থাপনের জন্য তিনি জেরুসালেম সফরেও যাবেন।
"আনোয়ার সাদাত যা বলেছিলেন - সে সময় তা মেনে নেয়া জনগণের পক্ষে খুবই কঠিন ছিল। যখন তিনি শান্তি স্থাপনের জন্য ইসরাইল সফরে যাবার কথা পার্লামেন্টে ঘোষণা করলেন তার পর আমি তাকে বললাম - আনোয়ার তুমি কি জানো যে এ জন্য সব আরব নেতাই তোমাকে ত্যাগ করবে?। তিনি বলেন, হ্যাঁ আমি জানি। কিন্তু আনোয়ার সাদাতের ধারণা ছিল, পরে জনগণ ঠিকই বুঝতে পারবে যে তিনি এটা করেছেন শান্তির জন্য।"

আনোয়ার সাদাত ১৯৭৯ সালে ইসরাইলের সাথে এক শান্তি চুক্তি করলেন। আনোয়ারর সাদাত এবং ইসরাইলি নেতা মেনাকেম বেগিনকে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হলো। কিন্তু জিহানের মন থেকে এই ভয় কখনো যায় নি যে তার স্বামীকে হয়তো জীবন দিয়ে এর জন্য মূল্য দিতে হবে।
"প্রতি বার, প্রতি দিন, প্রতি মিনিটে যখনই তিনি বাড়ির বাইরে যেতেন কাজের জন্য, বা কোন সভায় যোগ দিতে - আমার সব সময়ই মনে হতো তিনি হয়তো আর ফিরে আসবেন না।"
নিহত হবার এক মাস আগে আনোয়ার সাদাত নিজেও বোধ হয় অনুভব করেছিলেন যে এমন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, বলছিলেন জিহান সাদাত। "একদিন হাঁটতে হাঁটতে তিনি আমাকে বললেন, জিহান, আমার মনে হচ্ছে যে আমার যা কর্তব্য ছিল তা আমার করা হয়ে গেছে। আমার মনে হয় আমি খুশি মনেই আল্লাহর সাথে হাজির হতে যাচ্ছি।"
সেই শেষ মাসেই আনোয়র সাদাত তার বিরোধী শত শত লোককে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন। মিশরে এ সময় বিক্ষোভ চলছিল, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাকে উৎখাতের পরিকল্পনা করছিল।
অক্টোবর মাসেই কায়রোতে এক সামরিক প্যারেড পরিদর্শনের সময় ঘটলো সেই ঘটনা। প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সামনে দিয়ে যাবার সময় প্যারেডের একটি ট্রাক হঠাৎ থেমে গেল, তার থেকে নামলো চারজন সৈন্য , তারা গ্রেনেড ছুড়লো এবং গুলি করতে লাগলো। অন্তত ১০ জন লোক গুলিবিদ্ধ হলেন। প্রেসিডেন্ট সাদাতকে হেলিকপ্টারে করে দ্রুত সামরিক হাসপাতালে নেয়া হলো ।
জিহান সাদাত বলছিলেন, "আমার স্বামীকে এভাবে হারানো ছিল এক বিরাট আঘাত। তিনি ছিলেন আমার সারা জীবনের ভালোবাসা। তার মৃত্যুর পর জীবনের মুখোমুখি হওয়াটিা আমার জন্য ছিল খুবই কঠিন।"