ইন্টারনেট আছে, ইন্টারনেট নেই

মানুষের জীবন, ব্যবসা বাণিজ্য, রাজনীতি, সম্পর্ক --সবই বদলে দিচ্ছে ইন্টারনেট৻

Internet

যারা ইন্টারনেটের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল তাদেরকে এই সংযোগ থেকে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলে অথবা যাদের ইন্টারনেট নেই তাদেরকে এই সংযোগের আওতায় নিয়ে আসা হলে কি হতে পারে তার প্রতিক্রিয়া?

বিবিসির সুপারপাওয়ার অনুষ্ঠানমালার একটি অংশে এই বিষয়টিই দেখার চেষ্টা করা হয়েছে৻

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানীতে কয়েকটি পরিবার, যারা ইন্টারনেটের ওপর দারুনভাবে নির্ভরশীল, তাদের বাড়ি থেকে এক সপ্তাহের জন্যে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিলো ইন্টারনেট সংযোগ৻

অন্যদিকে নাইজেরিয়ার প্রত্যন্ত একটি গ্রামের মানুষজনকে এই সংযোগের আওতায় আনা ছিলো বড়ো ধরণের একটা চ্যালেঞ্জ৻

প্রথমে যাওয়া যাক দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সোলের একেবারে কেন্দ্রে৻

এখানকার এই বাড়িগুলো থেকে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার কাজটা খুব একটা সহজ ছিলো না৻ সোলের মাঝখানে সুউচ্চ একটি ভবনে লাইন কেটে দেওয়ার বিষয়ে প্রথমে ভবনের বাসিন্দাদের নিয়ে একটি সভা ডাকতে হয়েছিলো৻

তারপর বাড়িতে বাড়িতে যাওয়া হয়৻ তাদেরকে বলা হয় এক সপ্তাহের জন্যে ইন্টারনেট ছাড়াই বসবাসের কথা৻

এই কাজ করতে রাজী এরকম লোকজনের খোঁজে পোস্টার লাগানো হয়৻

কোরিয়ার নেটিজেন প্রজন্ম

দক্ষিণ কোরিয়ার লোকেরা কেন সহজে ইন্টারনেট ছেড়ে দিতে রাজি নয় তার পেছনে কারণ ‌রয়েছে৻ এখানকার লোকজন ইন্টারনেটের সাথে ঘণিষ্ঠভাবে জড়িত৻ পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই আছে এরকম সংযোগ৻ এখানে ব্রডব্যান্ডের গতিও খুব ভালো৻ দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্রডব্যান্ডের স্পিড এমনকি জাপানের চেয়েও দ্বিগুন৻

এখানকার লোকজনদের এখন আর সিটিজেন বলা হয় না, বলা হয় নেটিজেন৻ এদের প্রাত্যহিক জীবন এই নেটের সাথেই জড়িত৻

অবশেষে একটি পরিবার রাজী হলো৻ রাতের খাবারের সময় টেবিলের চারপাশে বসে কিম পরিবারের সদস্যরা আলোচনা করলেন ওয়েব বা ইন্টারনেট ছাড়া তারা কিভাবে সপ্তাহখানেক কাটাবেন৻ আরো একটি পরিবার, ইয়াংসি পরিবার, তারাও রাজী হলো এই পরীক্ষায় অংশ নিতে৻

তারপরই স্থানীয় যে অফিস থেকে এই বাড়িগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছিলো সেখান থেকে লোকজন এসে লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিলো৻

১৬ বছরের কিম সাং ইয়েন একজন প্রতিভাবান কম্পিউটার প্রোগ্রামার৻ ইন্টারনেটের ওপরে সে খুব বেশি নির্ভরশীল৻

সে বলছিল, `সাধারণত গড়ে প্রতিদিন আমি প্রায় ৬ ঘণ্টার মতো ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকি‘৻

পরীক্ষাটা শুরু হতে হতেই তাৎক্ষণিকভাবে কিছু অসুবিধা দেখা দিতে শুরু করলো৻ বন্ধ হয়ে গেলো অনলাইনে কেনাকাটা৻ লোকজন সেই পুরনো রীতিতে দোকানপাটে গিয়ে কেনাকাটা করতে শুরু করলো৻ প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু হল পরিবারগুলোর দিক থেকে৻

মি. কিমের বক্তব্য ছিল, ‘ইন্টারনেট সংবাদ নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, তারপর হাতের কাছেই বোতাম চেপে যেসব তথ্য পাওয়া যেতো সেগুলো না পাওয়া, আমরা কেমন যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি`৻

ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে যে পরিবারগুলো রাজি হয়েছিলো তারা সবাই একমত হলো যে তাদের এই অভিজ্ঞতার একটা ইতিবাচক দিকও আছে৻

কম্পিউটার থেকে মুক্ত হওয়ার পর দেখা গেলো যে পরিবারের সদস্যরা এখন একে অপরের সাথে আগের চেয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছে৻ সাং ইয়ান এখন পিয়ানো চর্চ্চার জন্যেও সময় পাচ্ছেন বেশি৻ পড়া হচ্ছে বইও৻

সাত দিন শেষে তাদের বাড়িতে আবারো ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া হলো৻ তারা আবার যুক্ত হলেন দ্রুত গতির তথ্য মহাসড়কে৻

সব সমাজের জন্যে হয়তো এই চিত্রটাই দেখা যাবে ভবিষ্যতে৻ দক্ষিণ কোরিয়া এই দৌড়ে শুধু এগিয়ে রয়েছে৻

নাইজেরিয়ার ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন গিটাটা

এবারে নাইজেরিয়ার একটি গ্রামের কথা যেখানে মানুষ ইন্টারনেটের কথা জানেই না৻ গ্রামের নাম গিটাটা৻ রাজধানী আবুজা থেকে গাড়ি চালিয়ে দু‘ ঘণ্টা উত্তরে৻ গ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটা মাত্র কাঁচা রাস্তা৻

নাইজেরিয়ার আর দশটা গ্রামের মতোই এই গিটাটা গ্রাম৻ কিন্ত এখানে যোগাযোগের ব্যবস্থা খুবই খারাপ৻

গ্রামে আসা মাত্রই এটা খুব সহজেই চোখে পড়ে৻ বিদ্যুৎ সরবরাহের জাতীয় লাইন বা গ্রিডের সাথেও যুক্ত নেই এই গ্রাম৻ নেই স্যাটেলাইট টেলিভিশন৻ ইন্টারনেট আরো পরের কথা৻ এমনকি খুব কম মানুষের কাছেই আছে মোবাইল ফোন৻

গিটাটার একেবারে মাঝখানে একটি বাজার৻ এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ মাছ ব্যাবসায়ী৻ কেউ কেউ মাংস ও কয়লা বিক্রি করে৻ বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের নেই বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিও৻ একেবারেই বিচ্ছিন্ন একটি গ্রাম হওয়ায় বাকি বিশ্ব সম্পর্কে কতোটা জানেন এখানকার মানুষ?

ইন্টারনেটের কথা জিজ্ঞাসা করলে একজন বললেন, ‘এটা একটা স্টেশন যা সারা দুনিয়ায় তথ্য সরবরাহ করে থাকে৻ সারা বিশ্বে কি হচ্ছে তার ছবিও তুলে ধরা হয় সেখানে‘৻

`আপনি কি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন‘?

`না৻ আমি শুধু জানি সেখানে কি করা হয়‘৻

`আপনি কি চান এই গ্রামে ইন্টারনেট আসুক‘?

‘অবশ্যই চাই`৻

`আপনার যদি ইন্টারনেট থাকতো তাহলে আপনি কি করতেন?`

তিনি বললেন, তিনি তার ভাই এবং বন্ধু বান্ধবের সাথে সহজে যোগাযোগ রাখতে পারতেন৻ ব্যবসার কাজ করতে পারতেন৻

গিটাটা গ্রামের প্রধান, সাকিন গিটাটার বাড়িতে জড়ো হয়েছিলেন গ্রামের কয়েকজন হোমরাচোমরা৻ ইন্টারনেট সংযোগসহ দুটো মোবাইল ফোন দেয়া হচ্ছে এ গ্রামে৻ সে ফোনগুলো কিভাবে বিতরণ করা হবে সে বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয়া হবেন৻ তারপর দেখা হবে কি ঘটে এই গ্রামে৻

গ্রামের নেতারা আলাপ আলোচনা করে ঠিক করলেন কে কে পাবে এই ফোন দুটো৻ তাদের হাতে ফোন তুলে দেওয়া হলো৻ এরা দুজন মোজেজ এবং নিকোলাস৻

ফোন হাতে নিয়ে নিকোলাস বললেন, ` গিটাটার সমস্যা সমাধানে এটা ব্যবহার করবো.‘৻

আর মোজেজের কথা ছিল: ‘লোকজনকে বলবো গিটাটায় কি হচ্ছে৻ বিশ্বের বাকি লোকেরা যদি এই গ্রামের সমস্যার কথা শুনতে চায় এবং তাদের কাছে কোনো সমাধান থাকে তাহলে তারা সবাই এখানে এসে গ্রামের লোকজনকে সাহায্য করতে পারে৻`