কারামুক্তির পর দিল্লিতে নেমে যা বলেছিলেন শেখ মুজিব

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
দিল্লিতে সেদিন ভাল ঠাণ্ডা পড়েছিল। বইছিল কনকনে হাওয়াও। দিল্লি পুলিশের কনস্টেবলরা সবাই খাকি ওভারকোট গায়ে চাপিয়ে বিশেষ ডিউটিতে এসেছিলেন ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারির সেই সকালে।
আমেরিকার এনবিসি টিভি চ্যানেলের সেদিনের একটা ভিডিও প্রতিবেদনে সেই ছবি দেখা যায়।
দিল্লির পুরনো পালাম বিমানবন্দরে নামল ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের একটি বিশেষ কমেট বিমান, যাতে রয়েছেন ভারতের এক বিশেষ অতিথি, আর তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরের টার্ম্যাকে হাজির ভারতের শীর্ষতম রাজনৈতিক নেতৃত্ব – দেশের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সঙ্গে আছেন তার মন্ত্রীসভার সব সদস্য, সেনাবাহিনী আর হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।

ছবির উৎস, Getty Images
লন্ডন থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ১০ই জানুয়ারি সকাল আটটা দশ মিনিটে দিল্লির মাটি ছুঁয়েছিল ওই ব্রিটিশ বিমানটি। নেমে এসেছিলেন সেই বিশেষ অতিথি - শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি।
সফর সঙ্গী দুই ভারতীয় অফিসার
ওই বিমানযাত্রায় তার পাশেই বসে লন্ডন থেকে দিল্লি এসেছিলেন এক ভারতীয় বাঙালি অফিসার শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জী। ষাটের দশকের মাঝামাঝি ঢাকায় ভারতীয় কূটনীতিক হিসাবে তিনি দেখা করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে।
তবে ৭২ সালের জানুয়ারিতে মি. ব্যানার্জী লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনে নিযুক্ত এক কূটনীতিক ছিলেন।
মি. ব্যানার্জী স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, লন্ডন থেকে ওড়ার পরে দুবার দাঁড়িয়েছিল রয়্যাল এয়ারফোর্সের বিমানটি। একবার সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে, দ্বিতীয়বার ওমানে। সে দুটিই ছিল যুক্তরাজ্যের বিমানবাহিনীর এয়ারবেস।
আর লন্ডন থেকে দিল্লি, তারপরে ঢাকা – পুরো বিমানযাত্রায় শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় পুলিশ অফিসার ভেদ মারোয়া। তিনি চাকরিজীবন শুরু করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ডায়মন্ড হারবারের সাব ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার হিসাবে, পরে দিল্লির পুলিশ কমিশনার হয়েছিলেন। অবসর নেওয়ার পরে ভারত শাসিত জম্মু-কাশ্মীর সহ একাধিক রাজ্যের রাজ্যপাল ছিলেন মি. মারোয়া।

ছবির উৎস, MUJIB100.GOV.BD
দুই ভারতীয় অফিসারের বয়ানে অমিল
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জী আর ভেদ মারোয়া – এই দুই অফিসারই শেখ মুজিবুর রহমানের যাত্রা সঙ্গী ছিলেন লন্ডন থেকে দিল্লি, তারপরে দিল্লি থেকে ঢাকা পর্যন্ত।
দুজনেই স্মৃতিচারণা করেছেন সেই যাত্রার। তবে দুজনের বয়ানে ফারাক রয়েছে বিস্তর।
মি. ব্যানার্জী নিজে একটা বই লিখেছেন, আর ভারতে সংবাদ পোর্টাল দ্য কুইন্টে কয়েক বছর আগে সেই যাত্রার কথা মনে করে একটা প্রবন্ধও লিখেছিলেন।
আর মি. মারোয়ার কাছ থেকে সরাসরি ওই বিমানযাত্রার বর্ণনা শুনে তা লিপিবদ্ধ করেছিলেন ভারতের সাংবাদিক সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত তার বই ‘ভাঙ্গা পথের রাঙা ধুলায়’ তে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকার মহিউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, “আমি দুজনের বয়ানই পড়েছি। তারা দুজনেই ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় এসেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গী হিসাবে। কিন্তু শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জীর লেখায় বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব আছে। তিনি তো আসলে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ -এর অফিসার ছিলেন, আর ভেদ মারোয়া ছিলেন ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসের অফিসার। দুজনকেই পাশে বসিয়ে বিমানে ছবি তুলেছিলেন মুজিবুর রহমান।''
“মি. ব্যানার্জী ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন। সেই সময়ে তিনি মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন আর তিনিই প্রথম ভারতীয় অফিসার যিনি তার সঙ্গে দেখা করেন বলেও দাবি করেছেন।''
''আবার লন্ডনের বিমানবন্দরে তিনিই মুজিবুর রহমানকে স্বাগত জানাতে হাজির হয়েছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। এটা পুরোপুরি অসত্য। আমার কাছে ভেদ মারোয়ার বয়ানটিই বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়,” বলছিলেন মহিউদ্দিন আহমদ।
তবে ভারতে মি. ব্যানার্জীর দেওয়া বয়ানটিই বেশি প্রচলিত, ভেদ মারোয়ারটি নয়। আবার বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ ভেদ মারোয়ার বয়ানটিই তুলে ধরেছে তাদের ওয়েবসাইটে।

ছবির উৎস, ALAMY
ভুট্টো বিদায় জানান শেখ মুজিবুর রহমানকে
রাওয়ালপিন্ডির মিয়াওয়ালি কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে পাকিস্তান সরকার পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের বিশেষ বিমানে তুলে দিয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে। একই দিনে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন ডা. কামাল হোসেন।
ঢাকার সিনিয়র সাংবাদিক সেলিম সামাদ বলছিলেন, “বিমানবন্দরে শেখ মুজিবুর রহমানকে বিদায় জানাতে হাজির ছিলেন স্বয়ং জুলফিকার আলি ভুট্টো। একথা আমাকে ২০০৪ সালে কানাডার মন্ট্রিয়লে নিজেই জানিয়েছিলেন ডা. কামাল হোসেন।“
লন্ডনে মুজিবুর রহমান যে সাংবাদিক সম্মেলন করেন, সেখানেও মি. ভুট্টোকে একাধিকবার “শুভকামনা” জানাতে শোনা গিয়েছিল।
মি. সামাদের কথায়, “যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশে কত বড় ক্ষয়ক্ষতি করে দিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী, সেটা কারাবন্দী অবস্থায় মি. রহমানের জানা সম্ভব ছিল না। সেজন্যই হয়তো জুলফিকার আলি ভুট্টোকে লন্ডনে তিনি শুভকামনা জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে ঢাকায় ফিরে এসে যখন তিনি দেশের অবস্থা স্বচক্ষে দেখলেন, তখন তার মনোভাব খুব স্বাভাবিকভাবেই বদলিয়ে গিয়েছিল।“

ছবির উৎস, Getty Images
ধূসর স্যুট, খয়েরি ওভারকোট
সেদিন পালাম বিমানবন্দরে শেখ মুজিবুর রহমানের অবতরণ নিয়ে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, “বিমান থেকে লাল কার্পেটে যখন পা দিলেন শেখ মুজিব, তখন তার ওপরে বর্ষিত হচ্ছিল গোলাপ আর গাঁদা ফুলের পাপড়ি।“
“তার পরনে ছিল ধূসর রঙের স্যুট আর দিল্লির ঠাণ্ডা হাওয়া থেকে বাঁচার জন্য তার ওপরে চাপিয়েছিলেন একটা খয়েরি রঙের ওভারকোট,” লিখেছিল দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।
এনবিসির ওই ভিডিও প্রতিবেদনেই দেখা যায় যে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জন্য বিমানের সিঁড়ির নীচে অপেক্ষা করছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও তার মন্ত্রীসভার সদস্যরা। ওই ভিডিওতে ব্যাকগ্রাউন্ডে শোনা যাচ্ছিল, “জয় বাংলা” আর “জয় বঙ্গবন্ধু” ধ্বনি।
ওই ১০ই জানুয়ারির সন্ধ্যায় কলকাতা আকাশবাণী প্রচার করেছিল এক বিশেষ সংবাদ বিচিত্রা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যে অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের আর পশ্চিমবঙ্গের মানুষের অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠেছিল। অন্য বেশিরভাগ দিনের মতোই ১০ই জানুয়ারির বিশেষ সংবাদ বিচিত্রাও পাঠ করেছিলেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
ভারতের সরকারি প্রচার মাধ্যম আকাশবাণী ও দূরদর্শনকে নিয়ন্ত্রণ করে যে সংস্থা, সেই প্রসার ভারতীর আর্কাইভে সেদিনের ওই অনুষ্ঠানটি রাখা আছে।

ছবির উৎস, Getty Images
‘আমি সোনার বাংলায় ফিরে যাচ্ছি’
মি. বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় সেদিনের অনুষ্ঠানের শুরুটা ছিল এরকম: “বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সংবর্ধনা জানালো বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, ভারত। ২১ বার তোপধ্বনির পর ভারতীয় সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে দিলেন গার্ড অফ অনার।“
ওই অনুষ্ঠানে বাজানো হয়েছিল ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরির স্বাগত ভাষণ।
তার উত্তরে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “বাংলাদেশে যাওয়ার পথে আপনাদের এই মহান দেশের মহান রাজধানীতে থামার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। আমার জনগণের প্রিয়তম বন্ধু - ভারতের জনগণ এবং মহৎ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা জানাতে আমি ন্যূনতম এটুকুই করতে পারি।“
“অবশেষে আমি সোনার বাংলায় ফিরে যাচ্ছি,” বলেছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি।

ছবির উৎস, FRONT PAGES 1953-1972
‘শেখ সাহেবকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনবই’
পালাম বিমানবন্দরে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাগত জানানোর পরে তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয় কাছেই দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের প্যারেড গ্রাউন্ডে।
আকাশবাণীর সংবাদ বিচিত্রা অনুষ্ঠানে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনা অনুযায়ী সেখানে সমবেত হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।
ওই প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ শোনানো হয়েছিল ১০ই জানুয়ারির সংবাদ বিচিত্রায়।
মিসেস গান্ধী বলেছিলেন, “আমরা এখানে, ভারতে, তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম আমাদের জনগণকে। প্রথম, যে শরণার্থীরা এখানে এসেছেন, তারা ফিরে যাবেন। দ্বিতীয়ত, আমরা সবরকম ভাবে মুক্তিবাহিনীকে, বাংলাদেশের মানুষকে সহায়তা করব। আর তৃতীয়ত, শেখ সাহেবকে আমরা নিশ্চই জেল থেকে ছাড়িয়ে আনব।
“আমরা তিনটে প্রতিশ্রুতিই পূরণ করেছি, আর এখন এক বিরাট বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে শেখ সাহেব ফিরে যাচ্ছেন তার পরিবারের কাছে, তার প্রিয় জনগণের কাছে,” বলেছিলেন মিসেস গান্ধী।
হিন্দি বক্তৃতার শেষে মিসেস গান্ধী স্লোগান দিয়েছিলেন, “জয় বাংলা”।

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলায় বক্তৃতা শেখ মুজিবুর রহমানের
প্যারেড গ্রাউন্ডের সভায় শেখ মুজিবুর রহমানের সেই বাংলা বক্তৃতার যে অংশটা আকাশবাণীতে শোনানো হয়েছিল, তাতে তার গলায় শোনা যায়, ,”আমি বিশ্বাস করি সেকুলারিজমে, আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্রে, আমি বিশ্বাস করে সোশ্যালিজমে। আমাকে প্রশ্ন করা হয়, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আপনার আদর্শে এত মিল কেন? আমি বলি, এটা আদর্শের মিল, এটা নীতির মিল, ,এটা মনুষ্যত্বের মিল, এটা বিশ্ব শান্তির মিল।
“আমি কিছুটা ইমোশনাল আজকে আপনারা বুঝতে পারেন, আমায় ক্ষমা করবেন। আবার আপনাদের ধন্যবাদ দিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি। জয় বাংলা, জয় হিন্দ,” এই বলে বক্তৃতা শেষ করেন শেখ মুজিবুর রহমান।
কয়েক সেকেন্ডের বিরতি দিয়ে তিনি বলে ওঠেন, “জয় ইন্দিরা গান্ধী”।
এরপরেই মিসেস গান্ধীকে মাইকে বলতে শোনা যায়, “বলুন, শেখ মুজিবুর রহমান জিন্দাবাদ।“








