টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই সনদ কার থাকবে- ভারতের না কি বাংলাদেশের?

টাঙ্গাইল শাড়ি সম্পূর্ণ হাতে বোনা হয়। তবে বর্তমানে মেশিন তাঁতেও বুনন করা হয়ে থাকে।

ছবির উৎস, NAZMUL HASAN

ছবির ক্যাপশান, টাঙ্গাইল শাড়ি সম্পূর্ণ হাতে বোনা হয়। তবে বর্তমানে মেশিন তাঁতেও বুনন করা হয়ে থাকে।
    • Author, মরিয়ম সুলতানা
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

ভারত সরকার টাঙ্গাইল শাড়িকে জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন (জিআই) বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে সনদ দেওয়ার পর থেকে দুই বাংলায় এ নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন আলোচনার পালে নতুন হাওয়া লাগালো বাংলাদেশ সরকার।

আটই ফেব্রুয়ারি দুপুরে বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্টস, ডিজাইন এবং ট্রেডমার্ক বিভাগ (ডিপিডিটি) টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একটি জার্নাল প্রকাশ করে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দু’টো দেশ থেকে একই পণ্য জিআই সনদ পেতে পারে কি-না।

কিংবা, ভারত যদি এখন ডিপিডিটি থেকে প্রকাশিত এই জার্নালের বিরোধিতা করে, তাহলে কী হবে? অথবা, টাঙ্গাইল শাড়ি’র জিআই ফিরে পেতে বাংলাদেশের করণীয় কী হবে?

টাঙ্গাইল তাঁত পল্লিতে সুতা কাটছেন এক নারী। (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, টাঙ্গাইল তাঁত পল্লিতে সুতা কাটছেন এক নারী। (ফাইল ছবি)

জিআই জার্নাল নং ৩২

এইসব প্রশ্নের উত্তর জানার আগে একটু জেনে নেয়া প্রয়োজন, সেই জার্নালে আসলে কী কী আছে।

কোনও পণ্যের জিআই সনদ পেতে হলে কোনও একটা সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানকে ডিপিডিটি বরাবর আবেদন করতে হয়। তাই, টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বীকৃতি পেতে গত ছয়ই ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক মো. কায়ছারুল ইসলাম ডিপিডিটি’র কাছে আবেদন করেছিলেন।

তার আবেদনে সাড়া দিয়েই ডিপিডিটি টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে। এই শাড়ির ইতিহাস, ঐতিহ্য, বুনন পদ্ধতি ও নিজস্বতা তুলে ধরে প্রকাশ করে জার্নাল নং ৩২।

জেলা প্রশাসকের করা আবেদনপত্রে বলা হয়েছে যে টাঙ্গাইল শাড়ি মূলত চার প্রকার এবং এখানে এই শাড়ির বৈশিষ্ট্যকে মোট ছয়টি ভাগে ভাগ ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো-

  • টাঙ্গাইল শাড়ি সম্পূর্ণ হাতে বোনা হয়। তবে বর্তমানে মেশিন তাঁতেও বুনন করা হয়ে থাকে।
  • টাঙ্গাইল জেলা যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীর পাশে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার জলবায়ু শাড়ি বোনার উপযোগী।
  • নদীর পানির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য সুতার প্রক্রিয়াজাতকরণ (যেমন- সুতা রঙ করা, মাড় দেওয়া) ভালো হয় এবং রঙের স্থায়িত্বের পাশাপাশি কাপড়ের স্থায়িত্ব ও গুণগতমান বৃদ্ধি পায়।
  • শাড়ির পাড়ের নকশায় বৈচিত্র্য রয়েছে। পুরো বুননের পর পাড়ের ও জমিনের কিছু কিছু নকশা আলাদাভাবে হাতে বুনন করা হয়।
  • আরামদায়ক একটি পরিধেয় বস্ত্র, যা যেকোনও ঋতুতে পরার উপযোগী।
  • টাঙ্গাইল শাড়ি মার্জিত, রুচিশীল ও আভিজাত্যপূর্ণ।

টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য ও শাড়ির বর্ণনা দেয়ার জন্য এই আবেদনপত্রে ঐ অঞ্চলে প্রচলিত বিভিন্ন প্রবাদও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, ‘নদী চর খাল-বিল গজারির বন; টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন’ বা, ‘চমচম, টমটম, তাঁতের শাড়ি; এই তিনে মিলে টাঙ্গাইলের বাড়ি’।

টাঙ্গাইল তাঁত পল্লিতে শাড়ি বুনছেন এক তাঁতি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, টাঙ্গাইল তাঁত পল্লিতে শাড়ি বুনছেন এক তাঁতি।

জার্নাল প্রকাশ হওয়া মানেই জিআই সনদ প্রাপ্তি নয়

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

শিল্প মন্ত্রণালয় ডিপিডিটি-তে জার্নাল প্রকাশের মাধ্যমে টাঙ্গাইল শাড়িকে প্রাথমিকভাবে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও এই স্বীকৃতি পাওয়া মানেই সনদ পাওয়া না।

টাঙ্গাইল শাড়ি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা, সেটা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও অন্তত দুই মাস।

এই বিষয়টি স্পষ্ট করতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সনদ পাওয়ার জন্য এই পাবলিকেশন পর্যাপ্ত না। জার্নালে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এটা এখন প্রাথমিক স্বীকৃতি পেল।"

"এরপর কারও কোনও অভিযোগ থাকলে তাদের আপিল করার সুযোগ থাকবে। আপিল না করলে দুই মাস পর টাঙ্গাইল শাড়ি জিআই সনদ পাবে। কিন্তু আপাতত স্বীকৃতিটা আমরা দিয়ে দিয়েছি।"

অর্থাৎ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জার্নাল প্রকাশ হওয়ার পর সর্বোচ্চ দুই মাস সময় থাকে। এই সময়ে ঐ পণ্যের সাথে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনও দেশ বা জেলা, এমনকি প্রতিষ্ঠানও অভিযোগ জানাতে পারে।

কিন্তু, বিরোধিতা করার জন্য দুই মাস থাকা সত্ত্বেও ভারতের আবেদনের বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে কেন কোনও অভিযোগ জানানো হলো না; ঘুরে-ফিরে এই প্রশ্নটি বারবার সামনে আসছে।

চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি ভারত টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ১০ বছরের জন্য সনদ দেয়। (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি ভারত টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ১০ বছরের জন্য সনদ দেয়। (ফাইল ছবি)

আগে আবেদন না করার পেছনে সরকারের যুক্তি

এ প্রসঙ্গে ডিপিডিটি জানিয়েছে, এই বিষয়টির ওপর জেলা প্রশাসনের লক্ষ্য রাখা উচিৎ ছিল।

তবে ভারতে জার্নাল প্রকাশের বিষয়টি জানা ছিল না উল্লেখ করে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক কায়ছারুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “জার্নালে (ভারতের) প্রকাশ হওয়ার বিষয়টা আমার জানা নেই। ভারত স্বীকৃতি দিয়েছে, আমি জানতে পারি দোসরা ফেব্রুয়ারি। তাদের ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে।”

কিন্তু তাড়াহুড়ো করে তারা এখনই কেন আবেদন করলো, এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, “টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে আমাদের ডকুমেন্টেশন রেডি হয়ে গেছিলো। রেফারেন্সিংয়ের কাজ চলছিলো। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মাঝে আমরা এমনিতেই এটি জমা দিতাম।”

মি. ইসলাম জানান, শুধুমাত্র টাঙ্গাইল শাড়ি না, টাঙ্গাইলের আরও কিছু পণ্যের জিআই স্বীকৃতির জন্য টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন অনেকদিন ধরেই কাজ করছে।

এদিকে ভারত সরকারের টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই সনদ দেয়া প্রসঙ্গে গত ছয়ই ফেব্রুয়ারি ডিপিডিটি মহাপরিচালক মো. মুনিম বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “জি আই সার্টিফিকেশনটাকে একটা পণ্য হিসেবে দেখতে পারেন। এখন আপনি (কোনও সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান) যদি আমার (ডিপিডিটি) কাছে না আসেন, তাহলে আমি তো আপনাকে দিয়ে দিতে পারবো না।”

যদিও দেশের সকল ঐতিহ্যবাহী পণ্যের জিআই রক্ষার জন্য একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ডিপিডিটি।

টাঙ্গাইলে একটি শো-রুমের তাকে তাকে সাজানো শাড়ি।

ছবির উৎস, NAZMUL HASAN

ছবির ক্যাপশান, টাঙ্গাইলে একটি শো-রুমের তাকে তাকে সাজানো শাড়ি।

টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই রক্ষার্থে বাংলাদেশ কী করবে

আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বিষয়ক সংস্থা 'ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশন’ (ডব্লিউআইপিও)-এর বিধিমালা মেনে একটা দেশ তাদের নির্দিষ্ট কোনও পণ্যকে জিআই স্বীকৃতি দেয়া হয়।

ডব্লিউআইপিও হলো ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন’ (ডব্লিউটিও)-এর অধীনস্থ একটি সংস্থা। বর্তমানে ডব্লিউআইপিও’র সদস্য দেশ ১৯৩টি। সব সদস্য দেশের ক্ষেত্রেই একই নিয়ম প্রযোজ্য।

ভারতের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশনস রেজিস্ট্রি থেকে জানা যায়, চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেড মার্কস বিভাগের পক্ষ থেকে টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ১০ বছরের জন্য সনদ দেওয়া হয়।

এই সনদ প্রাপ্তির জন্য ভারত আবেদন করেছিলো ২০২০ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে।

এখন টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই সনদ ফিরে পেতে হলে বাংলাদেশকে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে।

বিভিন্ন পণ্যের ন্যায্য সুরক্ষার জন্য বেশ কিছু আন্তর্জাতিক আইন আছে। সেগুলো হলো- প্যারিস কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোপার্টি (১৮৮৩), মাদ্রিদ এগ্রিমেন্ট অন ইনডিকেটর অব সোর্স (১৮৯১), লিসবন এগ্রিমেন্ট ফর দ্য প্রোটেকশন অব অরিজিন অ্যান্ড দেয়ার ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন (১৯৫৮) এবং ডব্লিউটিওর বাণিজ্যবিষয়ক মেধাস্বত্ব আইন (ট্রিপস-১৯৯৪)।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় তাঁত শাড়ি বুনছেন এক নারী। (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় তাঁত শাড়ি বুনছেন এক নারী। (ফাইল ছবি)

কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশ মাদ্রিদ এং লিসবন চুক্তির সদস্য না। বিবিসি বাংলাকে এমনটাই জানিয়েছেন ডিপিডিটি’র পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) আলেয়া খাতুন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ লিসবন চুক্তির সদস্যভুক্ত দেশ না। আবার, মাদ্রিদ প্রটোকল চুক্তিতে ইন্ডিয়া মেম্বার, কিন্তু আমরা না। তাই ডব্লিউআইপিও-তে তারাও জানাতে পারবে না, আমরাও পারবো না।”

তবে অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে আইনগতভাবে টাঙ্গাইল শাড়ি জিআই প্রাপ্তি সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়নি।

তিনি জানান যে এই বিষয়টির সুরাহা করতে হলে বাংলাদেশকে ভারতের আইনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং ঐ দুই যুক্তি ব্যবহার না করা গেলেও অন্য চুক্তিগুলো বাংলাদেশ ব্যবহার করতে পারবে।

“ভারতের আইনের অধীনে তিন মাসের ভেতরে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি এখনও আইনি সুরক্ষা চাইতে পারে। জানুয়ারি তো চলেই যাচ্ছে। ঐ আইনের অধীনে আগামী তিন মাসের মাঝে অ্যাপিল করতে হবে।”

দিল্লি বা ভারতে বাংলাদেশি হাইকমিশনের মাধ্যমে আইনজীবী নিয়োগ করে দ্রুত ভারতের আদালতে মামলা দায়ের করার পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।

সেইসাথে, তিনি আরও মনে করেন যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে অবস্থিত ডব্লিউআইপিও’র সঙ্গে বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে দ্রুত আলোচনা করা প্রয়োজন।

একইভাবে বাংলাদেশ সরকারের দ্রুতই একটি টাস্কফোর্স গঠন করা উচিৎ যেখানে নৃতত্ব, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, অর্থনীতি, ইতিহাস; সব ধরনের বিশেষজ্ঞ থাকবেন।

“এটা না করলে জার্নাল আধাখেচড়াভাবে হওয়ার সুযোগ থাকবে, যা আমাদের আবার বিপদে ফেলবে।”

ভারত বিরোধিতা করলে কী হবে?

এখন ভারত যেহেতু ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই পণ্য হিসেবে সনদ দিয়েছে, তাই ভারত সরকার চাইলে বাংলাদেশের ডিপিডিটি থেকে প্রকাশিত এই জার্নালের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারে।

ভারত বিরোধিতা জানালে বাংলাদেশ কী করবে, এটা জানতে চাইলে ডিপিডিটি’র পরিচালক আলেয়া খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ভারত বিরোধিতা করলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করবে। সেক্ষেত্রে আপত্তির নথিপত্র দেখাতে হবে, হিয়ারিংহবে। তারপর আমরা দুই পক্ষের ডকুমেন্টস দেখে সিদ্ধান্ত দেব।”

প্রায় একই কথা জানিয়েছেন সিনিয়র শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানাও।

তবে তিনি বলেন যে ভারত বিরোধিতা করলে বাংলাদেশের সামনে ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাইরে অন্য কোনও পথ খোলা নেই আপাতত।

ভারত বিরোধিতা করলে বাংলাদেশ ডব্লিউআইপিও-তে যাবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ঐ বিতর্কে আমরা যাবোই না। এখন আমরা প্রাথমিক স্বীকৃতি দিয়েছি। দুই মাস পরে আমরা সার্টিফিকেশন দিবো।”

“লিগ্যাল প্রসিডিওর বলতে আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাইল্যাটারাল নেগোসিয়েশনে যাবো।”

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “মাদ্রিদ প্রটোকলে আমরা এখনও স্বাক্ষর করি নি। এই কারণে আমাদের একমাত্র সমাধানের উপায় হলো বাই ল্যাটারাল। তারপরেও না হলে ডব্লিউআইপিও-তে যাবো।”

তবে তিনি গত আটই ফেব্রুয়ারি বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “ভারত যদি আমার জিআই-কে হ্যাম্পার করে, তখন আমরা ইন্টার্ন্যাশনাল ডিসপিউট সেটেলমেন্টে যাবো। মানে, তখন আমাদেরকে ডব্লিউআইপিও’র মাধ্যমে ডিসপিউট সেটেলমেন্ট করতে হবে।”

মিজ জাকিয়া আরও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের ট্রেডমার্কস অ্যাক্ট সংশোধন করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইল তাঁত পল্লীতে শাড়ি তৈরি করছেন কারিগররা। (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, টাঙ্গাইল তাঁত পল্লি শাড়ি তৈরি করছেন কারিগররা। (ফাইল ছবি)

“তবে ইন্ডিয়া যদি অভিযোগ করে, তবে তারা ডব্লিউটিও-তে করবে। আমাদের কাছে করবে না। তাই, এই বিষয়টা যদি ইন্টার্ন্যাশনাল হয়, তখন আমরাও ডব্লিউটিও-তে যাবো।”

একই কথা জানালেন সিনিয়র শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানাও।

তিনি বলেন, “ভারত যদি আমার জিআই-কে হ্যাম্পার করে, তখন আমরা ইন্টার্ন্যাশনাল ডিসপিউট সেটেলমেন্টে যাবো। মানে, তখন আমাদেরকে ডব্লিউটিও’র মাধ্যমে ডিসপিউট সেটেলমেন্ট করতে হবে।”

অর্থাৎ, ডব্লিউআইপিও'র বিধিমালা মেনে একটা দেশ নিজেই তাদের নির্দিষ্ট কোনও পণ্যকে জি আই সনদ দেয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডব্লিউআইপিও'র নিয়ম মেনে বাংলাদেশের ডিপিডিটি জিআই স্বীকৃতি ও সনদ দিয়ে থাকে।

তবে অন্য কোনও দেশ যদি সেই পণ্যের বিরোধিতা জানিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও’র কাছে অভিযোগ করে, তখন সেখানে ডব্লিউটিও’র হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশের নারীরা টাঙ্গাইল, জামদানী, সিল্ক সহ নানা ধরনের শাড়ি পরেন। (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের নারীরা টাঙ্গাইল, জামদানি, সিল্ক সহ নানা ধরনের শাড়ি পরেন। (ফাইল ছবি)

একই জিআই পণ্য দুই দেশে থাকতে পারে?

ডব্লিউআইপিও'র বিধিমালা মেনে একটা দেশ নিজেই তাদের নির্দিষ্ট কোনও পণ্যকে জি আই সনদ দিতে পারলেও ঐ একই পণ্যকে যখন অন্য কোনও দেশ নিজেদের বলে দাবি করে, তখন সমস্যা তৈরি হয়।

এমনটাই ঘটেছে টাঙ্গাইল শাড়ি ও সুন্দরবনের মধুর ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ এর আগে ২১টি পণ্যকে জিআই সনদ দিয়েছে। কিন্তু কখনও তাকে এমন অবস্থার মাঝে পড়তে হয়নি। অবশ্য, এর আগে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিলো।

২০১৭ সালে রাজশাহীর ফল গবেষণা কেন্দ্র ফজলি আমের জিআই সনদের জন্য আবেদন করে। কিন্তু সেখানে অভিযোগ জানিউএ চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি এসোসিয়েশন বলে, ফজলি আম তাদের পণ্য।

ডিপিডিটি পরিচালক আলেয়া খাতুন বলেন, “তখন আমরা দুই পক্ষের বক্তব্য, ডকুমেন্ট, মাটি ইত্যাদি পরীক্ষা করলাম। তারপর সেগুলোর ফলাফল দেখে নাম দিলাম রাজশাহী-চাঁপাই ফজলি আম।"

জিআই স্বীকৃতি নিয়ে দু'টো দেশের দ্বন্দ্বের উদাহরণ দিতে হলে বাসমতি চাল নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

দুই দেশে একই নামের জিআই পণ্য থাকলে তা 'ক্রস বর্ডার জি আই' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দুই দেশে একই নামের জিআই পণ্য থাকলে তা 'ক্রস বর্ডার জিআই' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। (ফাইল ছবি)

ভারতের জিআই আইন অনেক পুরনো। ১৯৯৯ সালে ভৌগোলিক নিদর্শন জিনিসপত্র (নিবন্ধকরণ এবং সুরক্ষা) আইন প্রণয়ন করে দেশটি। সেখানে পাকিস্তানে জিআই আইন করা হয়েছে ২০২০ সালে।

ভারত তাদের আইন অনুযায়ী ২০১৬ সালে বাসমতি চালকে 'বাসমতি' নামে জিআই পণ্য হিসেবে সনদ দেয়। যদিও এর জন্য আবেদন করা হয়েছিলো ২০০৮ সালে। এই চাল তাদের ১৪৫তম জিআই পণ্য।

এদিকে, পাকিস্তানের 'ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন অব পাকিস্তান' নামক ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সনদ দেওয়ার পাঁচ বছর পর ২০২১ সালে পাকিস্তানও এটিকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটিই পাকিস্তানের প্রথম জিআই পণ্য।

এই খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই দেশে একটি সমনামীয় পণ্য জিআই স্বীকৃতি পেতে পারে। ডব্লিউআইপিও আইন অনুযায়ী, এগুলো তখন 'ক্রস বর্ডার জিআই' হিসেবে পরিচিতি পায়।

Skip বিবিসি বাংলায় আরও খবর: and continue readingবিবিসি বাংলায় আরও খবর:

End of বিবিসি বাংলায় আরও খবর:

পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় বোনা 'টাঙ্গাইল শাড়ি'।

ছবির উৎস, NILAY BASAK

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় বোনা 'টাঙ্গাইল শাড়ি'।

ভারত টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই পেতে পারে কি না

টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বীকৃতিতে ভারত এর নাম উল্লেখ করেছে 'টাঙ্গাইল শাড়ি অব বেঙ্গল'। বাংলাদেশের এই খাত সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ভারত আইনত 'টাঙ্গাইল' নামটা ব্যবহার করতে পারে না।

বাংলাদেশের ডিপিডিটি'র পরিচালক মিজ আলেয়া বলেন, “ভারতে টাঙ্গাইল নেই, আমাদের টাঙ্গাইল আছে। তাদের শাড়িটার ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই বলেছে যে বাংলাদেশের তাঁতিরা সেখানে গিয়ে শাড়ি বানায়। আর, তারা একটা হাইব্রিড শাড়িকে টাঙ্গাইল শাড়ি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু হাইব্রিড কখনও জিআই হতে পারে না।”

“জিআই হতে হলে একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে এটা উৎপাদিত হতে হবে। তার একটা ঐতিহাসিক পটভূমি থাকতে হবে। টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহ্য আমাদের টাঙ্গাইল জেলাতেই আছে,” যোগ করেন তিনি।

মি. ভট্টাচার্যও বলেন যে টাঙ্গাইল শাড়ি কখনওই ভারতের জিআই পণ্য হতে পারে না।

“কোনও পণ্যের জিআই স্বীকৃতির জন্য তার ভৌগোলিক উৎস, মান এবং সুরক্ষার বিষয় জড়িত। আবেদনপত্রে বলেছে, টাঙ্গাইল শাড়ি যারা উৎপাদন করতেন, তারা হিন্দু ছিলেন এবং তারা অনেকেই দেশ ভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ চলে গেছেন।”

“কিন্তু তাঁতির বৈশিষ্ট্য পেশাভিত্তিক, ধর্মভিত্তিক না। আর তাঁতীরা ভারতে যাওয়ায় এই শাড়ির ভৌগোলিক পরিচয় তো তাতে পাল্টে যেতে পারে না। এই শাড়িকে জিআই করতে গিয়ে ভারত তথ্যের অপব্যবহার করেছে। তারা বক্তব্য বিভ্রান্তিকর, অসত্য ও অর্ধ সত্য। তাই এই আবেদনও বিবেচনা করার বিষয়," যোগ করেন এই অর্থনীতিবিদ।

রাজশাহী সিল্কের শাড়ি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রাজশাহী সিল্কের শাড়ি ২০২১ সালে জিআই পণ্য হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে

তবে টাঙ্গাইল শাড়ির ক্ষেত্রে ভারত এমন দাবি করতে না পারলেও সুন্দরবনের ক্ষেত্রে পারে উল্লেখ করে মিজ আলেয়া বলেন, “কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে হতে পারে। যেমন, সুন্দরবন। তাদের সুন্দরবন আছে, আমাদেরও আছে। তাদের মনিপুরী শাড়ি আছে, আমাদেরও আছে। তাদেরটা তাদের, আমাদেরটা আমাদের।”

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মিজ জাকিয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন, “যার যার টেরিটরি অনুযায়ী, সে জিআই দিতে পারে। ভারত তার টেরিটরিতে দিয়েছে। আমরা আমাদেরটা দিবো...সুন্দরবনের মধুর ক্ষেত্রে আমরা বলবো বাংলাদেশের সুন্দরবনের মধু, তারা বলবে ভারতের সুন্দরবনের মধু। এখানে কোনও সমস্যা নেই।"

মি. ভট্টাচার্যও তার বক্তব্যতে তুলে ধরেন যে ভারত যেমন টাঙ্গাইল শাড়িকে বাংলার শাড়ি বলতে পারে না, তেমনকি তাদের সুন্দরবনের মধুকেও শুধুমাত্র 'সুন্দরবনের মধু' বলতে পারে না।

কারণ এতে সমগ্র বাংলা বা সুন্দরবনকে বোঝায়, যা বিভ্রান্তিকর।

উল্লেখ্য, এবছর টাঙ্গাইল শাড়ির পাশাপাশি সুন্দরবনের মধুকেও জি আই সনদ দিয়েছে ভারত। যদিও সুন্দরবনের ৬০ শতাংশ পড়েছে বাংলাদেশের ভেতরে।

জামদানি শাড়ি, যা ২০১৬ সালে বাংলাদেশের জি-আই সনদ পায়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জামদানি শাড়ি, যা ২০১৬ সালে বাংলাদেশের জিআই সনদ পায়। (ফাইল ছবি)

জিআই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

কোন পণ্য কেনার সময় ক্রেতাদের নানা দিক ভাবতে হলেও জিআই পণ্য কেনার সময় তাদেরকে পণ্যের মান নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। কারণ জিআই পণ্যকে মানসম্পন্ন বলে ধরে নেয়া হয়।

ভৌগোলিক গুণ, মান ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকায় ক্রেতারা পণ্যটির ওপর আস্থা রাখতে পারেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের কৃষিপণ্য, প্রকৃতি থেকে আহরিত সম্পদ ও কুটির শিল্পকে এই সনদ দেয়। কারণ একটা পণ্য যখন জিআই স্বীকৃতি পায়, তখন সেটিকে বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং করা সহজ হয়।

শুধু তাই নয়, সনদ প্রাপ্তির পর ওই অঞ্চল বাণিজ্যিকভাবে পণ্যটি উৎপাদন করার বিশেষ অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা পায়।

অন্য কোনও দেশ বা অন্য কেউ তখন আর সেই পণ্যের মালিকানা বা স্বত্ব দাবি করতে পারে না।

টাঙ্গাইল শাড়ি যদি পাকাপাকিভাবে জিআই সনদ পেয়ে যায়, তখন ডিপিডিটি একে একটি জিআই ট্যাগ দিবে। যারা এই শাড়ির আসল উৎপাদনকারী, তারা দেশে বিদেশে সব জায়গায় ঐ ট্যাগটি ব্যবহার করতে পারবেন।