বিভুরঞ্জনের মৃত্যুর ঘটনায় আবার আলোচনায় বাংলাদেশের সাংবাদিকদের পেশাগত আক্ষেপ-অভিযোগ

বাংলাদেশে সাংবাদিকদের পেশাগত নিপীড়ন-বঞ্চনার অভিযোগ নতুন নয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের পেশাগত নিপীড়ন-বঞ্চনার অভিযোগ নতুন নয়
    • Author, মরিয়ম সুলতানা
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

'খোলা চিঠি' নামে একজন সাংবাদিকের একটি লেখা এবং এরপর নিখোঁজ হওয়া ও তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের বঞ্চনা ও নিপীড়নের অভিযোগ আলোচনায় উঠে এসেছে আবার।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক 'আজকের পত্রিকা'র সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মরদেহ পাশের একটি জেলার নদী থেকে উদ্ধার করা হয় শুক্রবার।

মৃত্যুর আগে স্থানীয় একটি গণমাধ্যমকে একটি লেখা ইমেইলে পাঠিয়ে 'নিখোঁজ' হয়েছিলেন তিনি।

তার 'জীবনের শেষ লেখায়' নিজের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাসহ আরও বেশকিছু অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরাও গতকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানারকম বঞ্চনা-শোষণের শিকার হওয়ার কথা লিখছেন।

বাংলাদেশের সংবাদকর্মীদের এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়।

এর আগেও নানা সময় সাংবাদিকদের অধিকারের প্রশ্নে অনেক রকম দাবি-দাওয়ার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেসব পূরণে চূড়ান্ত কোনো সমাধান আসেনি।

রাষ্ট্রের ক্ষমতায় পালাবদল এলেও সাংবাদিকদের দমনপীড়ন রোধে বা তাদের অধিকার আদায়ে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ খোদ সাংবাদিকদেরই।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আসার পরও পরিস্থিতি পাল্টায়নি বলে মনে করছেন অনেক সাংবাদিক ও বিশ্লেষক।

সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারও তার সর্বশেষ লেখায় এ ধরনের কথা লিখে গেছেন।

প্রবীণ সাংবাদিক ও কলাম লেখক বিভুরঞ্জন সরকার

ছবির উৎস, AJKERPATRIKA

ছবির ক্যাপশান, প্রবীণ সাংবাদিক ও কলাম লেখক বিভুরঞ্জন সরকার

সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের 'খোলা চিঠি'

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার আলাপ নতুন করে সামনে এসেছে বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু ও তার সর্বশেষ লেখাকে কেন্দ্র করে।

গত ২১শে অগাস্ট অফিস যাওয়ার কথা বলে সকাল ১০টার দিকে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকেই তিনি ছিলেন নিখোঁজ।

রাতে বাসায় না ফেরায় রমনা থানায় সাধারণ ডায়েরিও করে তার পরিবার। তবে নিখোঁজ হওয়ার দিন অর্থাৎ, বৃহস্পতিবার সকাল নয়টায় নিজের একটি লেখা স্থানীয় গণমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মেইল করেন তিনি।

যার ফুটনোটে উল্লেখ করেন–– "জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন"।

কিন্তু পরদিন শুক্রবার বিকেলে মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

একই দিনে তার লেখাটি 'খোলা চিঠি' শিরোনামে প্রকাশ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

ওই লেখায় তিনি নিজের ব্যক্তি ও কর্মজীবনের নানা ঘটনাপ্রবাহ, পাওয়া-না পাওয়া ও হতাশার কথা লিখেছেন। এমনকি অতীত এবং বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক নানা বাস্তবতা আর অভিযোগও উঠে এসেছে তার ওই লেখায়।

নিজের চাকরি জীবন নিয়ে তিনি লিখেছেন, "দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় এই পেশায় কাটিয়ে সম্মানজনক বেতন-ভাতা পাই না। এখন আমার যা বেতন তা বলে কাউকে বিব্রত করতে চাই না। তবে শুনেছি, আমার বিভাগীয় প্রধানের বেতন আমার প্রায় দ্বিগুণ।"

"আহা, যদি ওই বেতনের একটি চাকরি পেতাম তাহলেও হয়তো সংসার চালানোর জন্য নিয়মিত ধার-দেনা করার পেশাটি আমাকে বেছে নিতে হতো না!" আক্ষেপ করেন তিনি।

আরও পড়তে পারেন:
ন্যায্য ও সময়মতো বেতন-ভাতা না পাওয়ার অভিযোগ বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিকের

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ন্যায্য ও সময়মতো বেতন-ভাতা না পাওয়ার অভিযোগ বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিকের, প্রতীকী ছবি

তিনি লিখেছেন, "সংবাদপত্র আর কীভাবে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে, ঘরের মধ্যেই যেখানে অনিয়ম।"

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী আমলে সরকার থেকে কোনো সুবিধা না নেওয়া সত্ত্বেও তাকে "আজও 'আওয়ামী ট্যাগ' দেওয়া হয়"–– বলেও লেখাটিতে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মি. সরকার।

তিনি লিখে গেছেন, "গত বছর সরকার পরিবর্তনের পর গণমাধ্যমের অবস্থা আরও কাহিল হয়েছে। মন খুলে সমালোচনা করার কথা প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন। কিন্তু তার প্রেস বিভাগ তো মনখোলা নয়। মিডিয়ার যারা নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন তারা সবাই আতঙ্কে থাকেন সব সময়। কখন না কোন খবর বা লেখার জন্য ফোন আসে।"

তার একাধিক লেখার কারণে সরকারের চাপের কথাও বলেছেন তিনি।

আজকের পত্রিকার একাধিক সূত্র গতকাল বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, 'শেখ হাসিনার পালানো, পুলিশের গুলি ও মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে জঙ্গিরাও মানুষ হত্যা করেছে', এমন একটি লেখা সম্প্রতি নিজেদের পাতা থেকে প্রত্যাহার করেছে তারা।

এদিকে, প্রেস বিভাগ নিয়ে করা মি. সরকারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং-এর সাথে যোগাযোগ করলে বিবিসি বাংলাকে তাদের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বিভুরঞ্জন সরকার ইস্যুতে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না।

টেবিলে রাখা পত্রিকার স্তূপ (প্রতীকী ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের অভিযোগ প্রায় সব সরকারের আমলেই এসেছে বারবার (প্রতীকী ছবি)

অনলাইন-অফলাইনে সাংবাদিকদের আক্ষেপ

বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুর পর অনেক সংবাদকর্মী সাংবাদিকতা পেশার নানা সংকট, আর্থিক দুর্দশা নিয়ে ফেসবুকে লিখছেন।

প্রবাসী সাংবাদিক আশীফ এন্তাজ রবি গতকাল মি. সরকারকে "প্রিয় বিভুদা" সম্বোধন করে একটি খোলা চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে লেখেন, "তখন আমার দুই পকেট ভর্তি খ্যাতি। কোনও পয়সা নেই। কিন্তু টাকার বড়ো দরকার। সদ্য বিয়ে করেছি। সংসার চালাতে পারছি না।"

"তখন সবে বুঝতে শুরু করেছি, খ্যাতি দিয়ে একপোয়া চালও কেনা যায় না। বাড়িওয়ালা লেখা পড়ে প্রশংসা করে, কিন্তু বাড়িভাড়া মাফ করে না।"

বাংলাদেশের একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক নওয়াজ ফারহিন অন্তরা গতকাল ফেসবুকে লিখে জানান, "সাংবাদিকরা বেতন পান না। বেতন পান না, সেটাও লিখতে পারেন না"।

তিনি আরও লিখেছেন, নিয়মিত বেতন পাওয়ার জন্য "বাসায় চাল নাই, বাচ্চার পড়াশোনার খরচ দিতে পারছি না, মায়ের অষুধ নাই"-এসব বলার প্রয়োজন নাই।

এ বিষয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে হেড অব নিউজ হিসেবে কর্মরত ইলিয়াস হোসেন বিবিসিকে বলেন, "পত্রিকায় নিদেনপক্ষে ওয়েজবোর্ড আছে, টেলিভিশনে সেটাও নাই। এটি না থাকায় শ্রম আইনে মামলা করতে গেলেও বহু বছর লেগে যায়।"

অন্য আরেকটি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে কর্মরত একজন সাংবাদিক বলেন, টেলিভিশন তার নিজস্ব বেতন কাঠামো অনুযায়ী চলে।

নিজেকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে তিনি বলেন, "বছর চারেক আগে আমি ১৭ হাজার বেতন দিয়ে শুরু করছি, আর এখন আমার ২৭ হাজার। অথচ এই চার বছরে আমার অন্য সেক্টরের বন্ধুদের ক্যারিয়ার গ্রোথ দেখার মতো।"

যদিও চলতি বছরের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম বলেছিলেন, "একজন রিপোর্টার বা সাব-এডিটরকে ৩০, ৪০ বা ৫০ হাজার টাকা বেতন দিতে না পারলে ওই সব গণমাধ্যম বন্ধ করে দিতে হবে।"

সাংবাদিকদের বেতনভাতার কাঠামো হিসেবে সরকার বার বার ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করলেও সব গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ তা সুষ্ঠুভাবে মানেনি বলেও অভিযোগ আছে।

এদিকে, বেতন কাঠামোর দুরবস্থার কথা উল্লেখ করা ছাড়াও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার কথাও জানিয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ বলছেন, সরকারের ভয়ে তাদেরকে "সেলফ-সেন্সরশিপের" মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

একজন কিবোর্ডে টাইপ করছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সাংবাদিকতার ধরনে বর্তমানে অনেক পরিবর্তন এসেছে

'এই মৃত্যু গণমাধ্যমের অবস্থাটা পরিষ্কার করেছে'

বিভুরঞ্জন সরকারের আকস্মিক মৃত্যু এবং সাংবাদিকতার বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সাথে যোগাযোগ করেছে বিবিসি বাংলা।

কিন্তু তারা এ বিষয়ে কথা বলাটা 'নিরাপদ' কিংবা 'যথাযথ' হবে বলে মনে করেননি।

দৈনিক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ এ বিষয়ে বিবিসিকে বলেন, "বিভুরঞ্জনের এই মৃত্যুটা কীরকম মৃত্যু, আমি জানি না। কী হয়েছে তা জানি না। কিন্তু আমি যদি এটাকে আপাতত আত্মহত্যা (যেহেতু শেষ নোট দিয়ে গেছে, তাই সবাই বলছে) ধরি, এই মৃত্যুটাকে যদি বিশ্লেষণ করি, তাহলে আমরা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা (দেখতে পাবো)...রাষ্ট্র ও সমাজ যে চেহারা নিয়েছে, তার মধ্যে যে ক্রূরতা আছে, একটা নিষ্ঠুরতা আছে, এই সবগুলো জিনিস আমরা এখানে দেখতে পাবো।"

তিনি মনে করেন, "এই মৃত্যু আমাদের গণমাধ্যমের অবস্থাটা পরিষ্কার করে দেখিয়েছে যে আমরা কীরকম একটা শূন্যতার মাঝে আছি, সারগর্ভহীন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির মধ্যে আছি।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস এ প্রসঙ্গে বিবিসিকে বলেন, এই পেশায় আর্থিক দুরবস্থা আগের মতোই আছে।

"তবে এর বাইরে এখনো সেলফ সেন্সরশিপ হচ্ছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় পাঁচ তারিখের (গত বছরের পাঁচই অগাস্ট) আগে বা পরে কোনো গুণগত পরিবর্তন হয় নাই। ভয়ের ফর্ম, ভয়ের কারণ, ভয়ের উৎস চেঞ্জ হয়েছে। ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আসেনি," মন্তব্য করেন সাংবাদিকতার এই শিক্ষক।

তিনি আরও বলেন, আর্থিক চাপ ছাড়াও গণমাধ্যমগুলোকে সরকারের বিশেষ বাহিনী এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং-এর চাপও সামলাতে হচ্ছে। তার ভাষায়, "আগে বিশেষ বাহিনী এডিটর লেভেলে কল দিতো, এখন রিপোর্টারকে ফোন দেয় যে এটা করা যাবে না।"

প্রেস উইং-এর সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্বের বাইরে থেকে প্রেস সচিবের বাড়তি কথা বলার অভ্যাসকেও তিনি সাংবাদিকতার জন্য নেতিবাচক বিষয় বা বাড়তি চাপ বলে মনে করেন।

"কথায় আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে যখন সবচেয়ে কম দেখা যায়, তখন রাষ্ট্র ভালো চলে। প্রোক্টরকে বেশি দেখা যাওয়া মানে ইউনিভার্সিটিতে গণ্ডগোল, মারামারি হচ্ছে। একইভাবে, প্রেস সচিবকে যত কম দেখা যাবে, তত বেশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকবে বলে আমার মনে হচ্ছে।"

একজন সংবাদকর্মী লিখছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাংবাদিকতার সংকটের মূল কারণ রাজনৈতিক

গণমাধ্যমের সংকট উত্তরণের পথ কী

সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, বহু বছর ধরে চলে আসা এই সংকটের মূলে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে এবং এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ আর্থিক স্বনির্ভরতা ও ঐক্য।

সিনিয়র সাংবাদিক ও একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক তৌহিদুর রহমান মনে করেন, বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুর জন্য যে সংকট দায়ী, তার মূলে রয়েছে "আমাদের রাজনৈতিক অবক্ষয়"।

তারও ভাষ্য, "দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক শক্তিগুলো বারবার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। তাই দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমগুলোকে নিজেদের প্রতিপক্ষ ধরে নিয়ে দমননীতি চালিয়েছে।"

"আর এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো ওই "জনস্বার্থবিরোধী সরকারগুলোতে ঢুকে পড়ে টাকার জোরে একের পর এক মিডিয়া হাউজ কব্জায় নিয়েছে; আবার নতুন নতুন হাউজের জন্ম দিয়েও সাংবাদিকতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। নিরূপায় সাংবাদিকরা জীবিকার তাগিদে সেখানে চাকরি নিতে বাধ্য হয়েছেন।"

"অনেক সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকও তখন অশুভ শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নে শ্রম-মেধা বিনিয়োগ করেছে। আর যে গুটিকয়েক আপসহীন সাংবাদিক সেটাও পারেননি, তাদের পরিণতি কম-বেশি বিভুরঞ্জন সরকারের মতোই হয়েছে, হচ্ছে," বলেন তিনি।

বাংলাদেশে সাংবাদিকরা তাদের নিজেদের পেশাগত শোষণ ও নিপীড়ন নিয়ে কথা বলতে পারেন না এমন অভিযোগও রয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে সাংবাদিকরা তাদের নিজেদের পেশাগত শোষণ ও নিপীড়ন নিয়ে কথা বলতে পারেন না এমন অভিযোগও রয়েছে

এই সংকট থেকে মুক্তির জন্য 'সত্যনিষ্ঠ' সাংবাদিকদের মধ্যে একটা মজবুত ঐক্য গড়ে তোলা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মি. রহমান। পাশাপাশি, দেশে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতার বেশি বেশি সুযোগ সৃষ্টি করা ও কোলাবরেশনের মাধ্যমে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা শুরু করার কথাও তিনি বলেন।

সাংবাদিক সাজ্জাদ শরিফ মনে করেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা বেতন নিয়ে যে অনিশ্চয়তার মাঝে থাকেন, এই সমস্যার "রোগ অনেক গভীরে"।

তার মতে এর কারণ, "বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম সাংবাদিকতা করার জন্য আসেনি। তারা এসেছে ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার জন্য"।

তিনি বলেন, এ কারণেই বাংলাদেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যম দিনশেষে কোনো "প্রফেশনাল স্ট্রাকচার" দাঁড় করিয়ে "আর্থিকভাবে সামলম্বী হতে বা স্বনির্ভর আর্থিক কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারেনি। এটা পেশাদারি জায়গায় আসতে হবে, নয়তো এটা টিকে থাকা সম্ভব না।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসও মনে করেন যে সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা সম্মানজনক জায়গায় যেতে না পারার মূল কারণ মালিকপক্ষ।

"সরকারের বেঁধে দেওয়া ওয়েজবোর্ড কেউ মানে না। আর ওয়েজবোর্ড না মানলে তার ফলাফল কী হয়, সেটি তদারকি করার জায়গাও আমরা দেখছি না," বলেন তিনি।

"চাকরি হওয়া-যাওয়া, বেতন বাড়া, সব মালিকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। এই পেশাটি একটি শক্ত জায়গায় যেতে পারে নাই। মালিকরা যখন দেখে লাভ নাই, তারা বন্ধ করে দেয়। সাংবাদিকরা যে তার জন্য দশ বিশ বছরের লাভ তৈরি করে দিলো, সেটিকে গুরুত্ব দেয় না।"

তিনিও মনে করেন, আর্থিক কাঠামো শক্তিশালী করাই উত্তরণের মূল পথ।