বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব পাওয়া গর্ডন গ্রিনিজকে যেভাবে বিদায় নিতে হয়েছিল

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, নাগিব বাহার
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
সম্মানসূচক নাগরিকত্ব পাওয়ার বছর দুয়েক পর বাংলাদেশের সাথে গর্ডন গ্রিনিজের সম্পর্কটা যখন শেষ হয়, সেই পর্বটা কোনো পক্ষের জন্যই খুব একটা সম্মানজনক ছিল না। আর সেসময় মনোমালিন্যের মাত্রাটা এতোটাই তীব্র ছিল যে যুক্তরাজ্যের নর্দাম্পটনে ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম জয়ের দিন অর্ধেক ম্যাচশেষে মাঠ ছাড়েন তিনি। এরপর কাউকে কিছু না জানিয়ে ছেড়ে যান টিম হোটেল।
সেসময় গর্ডন গ্রিনিজের এত তীব্র অভিমানের কারণটা অবশ্য অজানা নয়।
১৯৯৭ এর এপ্রিলে বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করানোর পর ক্রিকেট দলের কোচ হিসেবে তাকে যে শুধু সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছিল তাই নয়, তাকে রীতিমতো নায়কোচিত সম্মান দেয়া হতো বাংলাদেশে।
তাকেই দু বছরের মাথায় বিশ্বকাপ চলাকালীন অবস্থায় দলের শেষ ম্যাচের আগেরদিন বরখাস্ত করা হয়।
১৯৯৯ সালের ৩১শে মে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ম্যাচে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে প্রথম জয় পায়। চৌঠা জুন দল দেশে ফেরার পর ঘটা করে সংবর্ধনা দেয়া হয় তাদের।
জাঁকজমকপূর্ণ সেই সংবর্ধনায় ছিলেন না দলের কোচ। কারণ যুক্তরাজ্য থেকে দলের সাথে দেশেই ফেরেননি তিনি।
সেসময়কার টিম ম্যানেজার তানভীর মাযহার দেশে ফেরার পর সাংবাদিকদের এমনও বলেছিলেন যে তাকে লন্ডনে খোঁজার চেষ্টা করা হলেও তাকে 'পাওয়া যায়নি।'
আর ঘটনাক্রমে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম জয়ের আগে তাকে বরখাস্ত করায় পত্রিকাগুলোতেও অনেকটাই চাপা পরে যায় তার চাকরিচ্যুতির খবর।
পরের কয়েকদিনের পত্রিকার প্রধান খবরেও জয়, উদযাপন আর ক্রিকেটারদের বীরত্বগাঁথার খবরে গর্ডন গ্রিনিজের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের মত তিক্ত ইস্যু বিশেষ জায়গা পায়নি।

যে কারণে আকস্মিকভাবে বরখাস্ত হন গর্ডন গ্রিনিজ
সেসময় পত্রপত্রিকায় গ্রিনিজ ইস্যুতে খুব বেশি আলোচনা না হলেও কিছুদিন পরেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের সম্মুখীন হন বোর্ড কর্তারা। তৎকালীন বোর্ড প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরীও গত ২৬ বছরে অনেক সাক্ষাৎকারেই গর্ডন গ্রিনিজকে বরখাস্ত করার কারণ বেশ স্পষ্টভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন।
"৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিন গর্ডন গ্রিনিজ পাবলিকলি একটা বিবৃতি দিয়ে বললো যে 'বাংলাদেশ ইজ নট রেডি ফর টেস্ট ক্রিকেট', এটাই ছিল মূল বিষয়।"
সাবের হোসেন চৌধুরী ২০২০ সালে ফ্রিল্যান্স ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান মোহাম্মদের ইউটিউব চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাৎকারে এভাবেই মি. গ্রিনিজকে বরখাস্ত করার কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ঐ সাক্ষাৎকারে মি. চৌধুরী বলেছিলেন যে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতা, ১৯৯৮ সালে ঢাকায় মিনি ওয়ার্ল্ড কাপ (পরবর্তীতে যে টুর্নামেন্ট আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি হিসেবে ধারাবাহিকভাবে আয়োজিত হয়েছে) আয়োজন থেকে শুরু করে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের পুরোটাই ছিল টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জনের পরিকল্পনার অংশ।
ঐ পর্যায়ে কোচের এমন মন্তব্য দলের লক্ষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল বলেই মি. গ্রিনিজকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, এমনটাই ভাষ্য ছিল মি. চৌধুরীর।
"তাকে (গর্ডন গ্রিনিজকে) আমি বললাম, তুমি যদি কোচ হয়ে পাবলিকলি বলে দাও যে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাসের জন্য প্রস্তুত নয়, তাহলে আমি বোর্ড হিসেবে কোন মুখে গিয়ে বলবো যে আমাকে টেস্ট স্ট্যাটাস দাও। তারা বলবে, তোমার কোচই তো বলছে তোমরা রেডি না।"
সাবের হোসেন চৌধুরীর ভাষ্য, এই কারণেই বিশ্বকাপে ম্যাচের কিছুক্ষণ আগে কোচকে বরখাস্ত করা হয়। ঐ সাক্ষাৎকারে মি. চৌধুরী বলেছিলেন যে টিম ম্যানেজমেন্ট এবং সিনিয়র খেলোয়াড়দের সাথে আলোচনা করেই ঐ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।
তৎকালীন বোর্ড প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, গর্ডন গ্রিনিজের বরখাস্তের বিষয়টি ছিল মি. গ্রিনিজের সাথে বোর্ডের 'এ প্রফেশনাল অ্যাগ্রিমেন্ট', অর্থাৎ পেশাদার একটি সমঝোতা।

তবে বোর্ড কর্তৃপক্ষ কতটা 'পেশাদারিত্বের' সাথে ঐ পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন, সে প্রশ্ন তোলাই যায়।
একত্রিশে মে'র ম্যাচের তিনদিন পর চৌঠা জুন বাংলাদেশ দল দেশে ফিরলেও সেই বহরে ছিলেন না গ্রিনিজ। এমনকি ঐ তিনদিন তিনি দলের কারো সাথে কথা বলেছিলেন কিনা, বা কর্মকর্তারা তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন কিনা, সেবিষয়েও দেশে ফিরে বেশ ধোঁয়াশাই তৈরি করেছিলেন বোর্ড কর্মকর্তারা।
ঢাকার বাংলা দৈনিক পত্রিকা মানবজমিনের হয়ে ওই বিশ্বকাপ কাভার করতে যাওয়া ক্রীড়া সাংবাদিক শহিদুল আজমও বলছিলেন যে পুরো বিষয়টিতে যথেষ্ট অস্পষ্টতা ছিল।
"সেদিন (পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আগেরদিন) আমি আর আরেকজন সাংবাদিক টিম হোটেলে অপেক্ষা করছিলাম, কারণ আমরা ধারণা করছিলাম সেরকম কিছু একটা হবে। তাই আমরা গর্ডন গ্রিনিজের প্রতিক্রিয়া নিতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু হোটেলের একজন স্টাফ এসে আমাদের জানান যে টিম ম্যানেজমেন্ট চায় না যে আমরা সেখানে থাকি।"
মি. আজম বলছিলেন, বরখাস্তের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর বোর্ড প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী তাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন যে 'গর্ডন গ্রিনিজকে নিয়োগ দেয়াটাই ছিল ভুল।'
সাংবাদিক শহিদুল আজম জানান পরদিন, ৩১শে মে, গর্ডন গ্রিনিজ মাঠে গেলেও লাঞ্চের সময়ই মাঠ ছাড়েন। আগেরদিন যেই কোচকে বরখাস্ত করা হয়েছে, মাঠে তার উপস্থিতি খেলোয়াড় আর বোর্ড কর্মকর্তাদের জন্যও 'কিছুটা বিব্রতকর' ছিল বলে মন্তব্য করেন মি. আজম।
সেদিন লাঞ্চের সময় মাঠ ছাড়ার পর মি. গ্রিনিজকে আর বাংলাদেশ দলের সাথে দেখা যায়নি।
জুনের দুই তারিখ সাবের হোসেন চৌধুরীর বরাত দিয়ে ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোতে খবর প্রকাশিত হয় যে গ্রিনিজকে শুধু কোচের দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হলেও বোর্ডের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।
সে বছরের ত্রিশে জুন পর্যন্ত দলের কোচ হিসেবে চুক্তি থাকলেও, বোর্ড সভাপতির দাবি অনুযায়ী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করতে তিনি কখনো বাংলাদেশে ফেরেননি কেন, সে ব্যাখ্যাও কখনো সঠিকভাবে পাওয়া যায়নি।
শহিদুল আজম বলছিলেন, "পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের পর কোচের বরখাস্ত ইস্যু অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। বাংলাদেশ দল দেশে ফেরার পর এই বিষয় নিয়ে খুব বেশি আলোচনাও হয়নি।"

ছবির উৎস, Getty Images
কাকতালীয় ব্যাপার হলো, যেই টেস্ট স্ট্যাটাস নিয়ে করা মন্তব্যের জেরে গর্ডন গ্রিনিজ বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ জয়ের উদযাপনে ছিলেন না, তাকে বরখাস্ত করা সেই সাবের হোসেন চৌধুরীও উপস্থিত থাকতে পারেননি টেস্ট স্ট্যাটাসের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে।
এ বছরের ২৬শে জুন বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ২৫ তম বর্ষপূর্তি পালন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরীখে আমন্ত্রিত ছিলেন না টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার সময়কালের বোর্ড প্রেসিডেন্ট, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরি করা আমিনুল ইসলাম বুলবুল অবশ্য ওই অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন যে 'ছোট পরিসরে' আয়োজন করায় সবাইকে আমন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
বরখাস্তের ঘটনার পরে গর্ডন গ্রিনিজ একাধিকবার বাংলাদেশে এসেছেন।
তার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ নিয়ে আলাদা একটি ছোট বিভাগই রয়েছে, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে বাংলাদেশের মানুষের জন্য তার হৃদয়ে 'উষ্ণ' একটি অংশ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশকে 'সেকেন্ড হোম' হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
তবে বাংলাদেশ তার এই ভালোবাসার যথাযথ প্রতিদান দিয়েছে কিনা, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
অনেকেই মনে করেন সেসময় বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাসের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়া গর্ডন কাথবার্ট গ্রিনিজের বরখাস্ত হওয়াটাই উচিৎ ছিল। আবার টেস্টে ২৫ বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়ে 'গ্রিনিজ ঠিকই বলেছিলেন' বলার মানুষও কম নেই।








