জ্যোতিষীর পরামর্শে গড়া হয়েছিল ভারতের ফুটবল টিম?

ক্রোয়েশিয়ার প্রাক্তন বিশ্বকাপ ফুটবলার ইগর স্টিমাচ (সাদা জার্সি পরিহিত) এখন ভারতের কোচ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ক্রোয়েশিয়ার প্রাক্তন বিশ্বকাপ ফুটবলার ইগর স্টিমাচ (সাদা জার্সি পরিহিত) এখন ভারতের কোচ
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা

ফুটবল হোক বা যে কোনও খেলা, টিম নির্বাচন করে থাকেন কোচ, নির্বাচকদের প্যানেল বা অধিনায়করা। তবে গত বছর ভারতের জাতীয় ফুটবল দলে কারা খেলবেন, সেটা না কি ঠিক করে দিয়েছিলেন একজন জ্যোতিষী!

এই তথ্য একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত হওয়ার পরে তা নিয়ে এখন দেশের ফুটবল মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

আবার যুক্তিবাদীরা বলছেন খেলোয়াড় নির্বাচিত হবেন তার পারদর্শিতার ওপরে নির্ভর করে, কিন্তু জন্ম সময়, ঠিকুজি ইত্যাদি লক্ষণ ‘শুভ’ হলে তবেই জাতীয় দলে জায়গা পাবেন, এ কোন ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি?

খেলোয়াড় এবং ক্রীড়া সাংবাদিকরা অবশ্য বলছেন, ক্রীড়া মহলে বহু ধরণের কুসংস্কার রয়েছে বহু কাল ধরেই, এবং ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলের মতো মঞ্চেও এরকম কুসংস্কারের ছবি দেখা গেছে।

মূলত আফ্রিকার দেশ এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে এধরণের কুসংস্কার খুব বেশি দেখা যায় বলে জানাচ্ছেন তারা।

খেলোয়াড়দের ঠিকুজি বিচার করে জ্যোতিষী সিদ্ধান্ত নিতেন কোন ম্যাচে কে খেলবেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, খেলোয়াদের ঠিকুজি বিচার করে জ্যোতিষী সিদ্ধান্ত নিতেন কোন ম্যাচে কে খেলবেন - প্রতীকি চিত্র

যেভাবে জ্যোতিষী ঠিক করতেন কে খেলবে

ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে ২০২২ সালের মে জুন মাসে এএফসি এশিয়ান কাপের কোয়ালিফাইং রাউন্ডের ম্যাচ চলাকালীন ভারতীয় দলের কোচ ইগর স্টিমাচের সঙ্গে দিল্লির এক জ্যোতিষীর প্রায় একশোটি মেসেজ আদানপ্রদান হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে মি. স্টিমাচ ভূপেশ শর্মা নামে ওই জ্যোতিষীকে একটি মেসেজ পাঠান, যাতে লেখা হয়েছিল, “১১ই জুনের এই তালিকার খেলোয়াড়দের প্রত্যেকের চার্টগুলি দেখে নিন।“

আবার একই মেসেজ পাঠানো হয় আফগানিস্তানের সঙ্গে ম্যাচের দুদিন আগে। ওই ম্যাচে ভারত ২-১ গোলে জিতেছিল।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই জ্যোতিষী উত্তর পাঠান। কারও সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন, “ভালো” অথবা “খুবই ভাল করার সম্ভাবনা আছে, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বর্জন করতে হবে”।

কারও সম্বন্ধে আবার তার মন্তব্য, “তার জন্য খুবই ভালো দিন কিন্তু বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে” অথবার লিখেছেন, “এদিনের জন্য সুপারিশ করা যাচ্ছে না”।

খেলোয়াড়দের জন্ম তারিখ, সময় ইত্যাদি তথ্যও ওই জ্যোতিষীর কাছে পাঠানো হয়েছিল।

ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন মহাসচিব কুশল দাস এই জ্যোতিষীর সঙ্গে মি. স্টিমাচের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন বলেও জানিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

ওই সংবাদপত্রের কাছে মি. দাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং এটাও জানিয়েছেন যে জ্যোতিষী ভূপেশ শর্মাকে ১২ থেকে ১৫ লাখ ভারতীয় টাকা দেওয়া হয়েছিল।

আবার সংবাদ সংস্থা পিটিআই ভারতীয় দলের এক সদস্যকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে প্রায় ১৬ লক্ষ ভারতীয় টাকার বিনিময়ে জ্যোতিষীর পরিষেবা নেওয়া হয়েছিল।

এই ঘটনা সামনে আসার পরে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

ক্রোয়েশিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার পরে ইগর স্টিমাচ সেদেশের জাতীয় কোচও ছিলেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ক্রোয়েশিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার পরে ইগর স্টিমাচ সেদেশের জাতীয় কোচও ছিলেন

ঠিকুজি-কুষ্ঠি বিচার করে নির্বাচন?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ক্রীড়াপ্রেমীদের একটা অংশ এবং যুক্তিবাদী সংগঠনগুলি প্রশ্ন তুলছে একজন খেলোয়াড় তো নির্বাচিত হবেন তার দক্ষতার ওপরে ভিত্তি করে, সেখানে তার ঠিকুজি-কুষ্ঠি আসবে কেন?

পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ বলছে বর্তমানে ক্রীড়া-বিজ্ঞান যে উচ্চতায় পৌঁছিয়ে গেছে, সেখানে একজন খেলোয়াড়কে তার জন্ম সাল, তারিখ সময় ইত্যাদির ওপরে নির্ভর করে নির্বাচন করা হবে, এটা মানা যায় না।

ওই মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ মহাপাত্র বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “এটা খুবই পরিতাপের বিষয় যে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, তার পরিশ্রম বা তার স্কিল ওপরে ভরসা না করে তার ঠিকুজির ওপরে নির্ভর করে ঠিক করা হচ্ছে যে সে দলে থাকবে কী না।

“একদিকে যখন বিজ্ঞান মনস্কতার জন্য আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি, তখন দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞান মনস্কতা যাতে তৈরি না হয়, সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ। এর মধ্যে আবার দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সরকারি বিভাগও এর মধ্যে যুক্ত হয়ে পড়ছে। এই ঘটনার ধিক্কার জানানো ছাড়া অন্য কিছু কি বলা যায়?” বলছিলেন মি. মহাপাত্র।

আবার ক্রীড়া-প্রেমী ও শিক্ষক অয়ন চক্রবর্তীর কথায়, “আমরা যখন জি টুয়েন্টি সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছি, আবার গণেশ ঠাকুরের হাতির মতো মাথাটা নাকি আদিকালে প্লাস্টিক সার্জারির নিদর্শন এসবও বলা হচ্ছে। একই ভাবে আমরা ফুটবলে সামনের দিকে এগোনোর চেষ্টার মধ্যেই জ্যোতিষীকে দিয়ে টিম সিলেকশন করাচ্ছি। আমরা যে আসলে কোথাও এগোচ্ছি না, পিছিয়েই যাচ্ছি, তার প্রমাণ এই ঘটনা।“

যদিও ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তারা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমকে ‘এখনই কিছু বলা হবে না’।

তবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনটি সামনে আসার পরে মুখ খুলেছেন ভারতীয় দলের কোচ ইগর স্টিমাচ নিজেই।

বিষয়টি নিয়ে তিনি সব তথ্য সামনে আনবেন খুব শীঘ্রই এমন কথা লিখেছেন সামাজিক মাধ্যম এক্সে (পূর্বতন টুইটারে)।

মি. স্টিমাচ এও বলছেন যে ওই সব তথ্য সামনে এলেই বোঝা যাবে যে “কতটা এবং কে এই দেশের ফুটবলের জন্য যত্ন নেয়।“

“সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগে একটু ভেবে নেবেন। ভারতকে ফুটবল খেলিয়ে দেশ হিসাবে তৈরি করার আমার স্বপ্নটা এখনও বেঁচে আছে,” লিখেছেন ইগর স্টিমাচ।

ভারতের জাতীয় ফুটবল দলের প্রাক্তন অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া (বাঁদিকে)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের জাতীয় ফুটবল দলের প্রাক্তন অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া (বাঁদিকে)

'কলকাতার ফুটবলেও মানা হয় এসব'

প্রাক্তন জাতীয় অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া বলছেন ফুটবল মাঠের কুসংস্কার নতুন কোনও বিষয় নয়।

ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাতকারে মি. ভুটিয়া বলেছেন, “এটা নতুন কিছু নয়। অনেক বিশ্ববিখ্যাত কোচ, বিশেষত আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতে জ্যোতিষীদের খুব মান্য করে"

“কলকাতার ফুটবলেও মানা হয় এসব (সংস্কার)। খালিদ জামাল বা সুভাষ ভৌমিকরা অন্য দলের গোলপোস্টের কাছে ফুল রেখে দিতেন,” জানিয়েছেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক।

অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পেরুর বিশ্বকাপ ম্যাচের আগে বিপক্ষ দলের ফুটবলারদের ছবির ওপরে ঝাড়ফুঁক করছেন ওঝারা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পেরুর বিশ্বকাপ ম্যাচের আগে বিপক্ষ দলের ফুটবলারদের ছবির ওপরে ঝাড়ফুঁক করছেন ওঝারা

বিশ্বকাপ ফাইনালের সকালে যা ঘটেছিল

কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক রূপক সাহা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ফুটবল-খেলিয়ে দেশগুলোর মধ্যে আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকাতে কুসংস্কার ভীষণভাবে কাজ করে।

তার কথায়, এগুলো মূলত আফ্রিকার দেশে প্রচলিত ছিল, সেখান থেকে লাতিন আমেরিকায় গেছে।

“ফুটবলে কুসংস্কারের প্রচলন সবথেকে বেশি আফ্রিকায়, সেখান থেকে লাতিন আমেরিকাতেও খুব চলে এসব। তবে স্টিমাচ তো ক্রোয়েশিয়ার মানুষ, ইউরোপ তো অনেক বেশি আলোকপ্রাপ্ত। তিনি এটা কেন করতে গেলেন জানি না,” বলছিলেন মি. সাহা।

“আমি নিজে ওয়ার্ল্ড কাপ কভার করার সময়ে ৯৮ সালের ফাইনালের দিন সকালে একটা ঘটনা দেখেছি। ব্রাজিল আর ফ্রান্স সেদিন ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল খেলবে। হোটেলের নীচে দেখি এক ব্রাজিলীয় দম্পতি কী একটা পোড়াচ্ছে। অনুমতি না নিয়েই ওরা কীসব পোড়াচ্ছিল, তা নিয়ে মারাত্মক ঝামেলা।

“আমি নীচে গিয়ে দেখি ফ্রান্সে সব ফুটবলারদের ছবি পোড়াচ্ছিল তারা। আমি জিজ্ঞাসা করাতে ভদ্রলোক বললেন যে তাদের একটা সংস্কার আছে ছবিগুলো পুড়িয়ে ছাইটা নিয়ে গিয়ে যদি গোলপোস্টের পেছনে রেখে দেওয়া যায় তাহলে ফ্রান্স গোল খেয়ে যাবে, ব্রাজিল জিতে যাবে,” বলছিলেন রূপক সাহা।

সেবার অবশ্য ফ্রান্সই বিশ্বকাপ জিতেছিল।

তার কথায়, প্রত্যেকটা আফ্রিকান দেশ বিশ্বকাপ খেলতে যায় ‘ওঝা’ নিয়ে।

“প্রত্যেকটা ওয়ার্ল্ড কাপে আফ্রিকার দেশগুলো যে সব ওঝা নিয়ে যায়, তাদের নিয়ে বেশ কাড়াকাড়ি পড়ে যায় দেখেছি। কিন্তু কোনওবার ওইসব ওঝার মন্তর টন্তর খাটে না,” জানাচ্ছিলেন রূপক সাহা।

তিনি আরও বলছিলেন, বিদেশে শুধু নয়, কলকাতার ফুটবলেও এধরণের কুসংস্কার মানতে দেখেছেন তিনি।