ভারী বৃষ্টিতে হাওরে বন্যা, ধান নিয়ে দুই সংকটে কৃষক

- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
"বৃষ্টি এবার আগেই শুরু হইয়া গেছে, ৩২ কাঠা জমির ধান কাটতা ফারতাছি না (কাটতে পারছি না)। বৃষ্টিতো এবার চইত (চৈত্র) মাস ভরাই, কাজ করতাম ফারতাছি না," কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার হাওর এলাকার কৃষক সবুজ সরদার।
এই জেলার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের এই কৃষক বলছিলেন, সাধারণত বৈশাখ মাসের আগেই তারা বোরো ধান কেটে ফেলেন। তবে এবার চৈত্র মাসজুড়ে বৃষ্টি হওয়ায় ধান পাকলেও কাটতে পারেননি। আর এখন সেসব ধানই বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।
গত কয়েকদিনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হাওরপ্রধান এলাকা বা জেলাগুলো, যেমন নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারের অনেক অংশই পানিতে প্রায় তলিয়ে গেছে।
এই সময় হাওর অঞ্চলের প্রধান ফসল বোরো ধান। মূলত ১৫ই এপ্রিল থেকে ১৫ই মে পর্যন্ত এই সময়টি হাওরে বোরো ধান কাটার সময় বলে জানান কৃষি কর্মকর্তারা।
কিন্তু এবার মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকেই বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি এবং ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় এই বোরো ধান কাটার কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটেছে বলে জানান কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা।
এক দিকে ধান কাটা নিয়ে সংকট, আবার আকাশে মেঘ থাকায় কাটা ধান শুকানো নিয়েও বিপত্তির কথা বলছেন চাষিরা। ফলে এখন দুই দিন থেকেই সংকটে আছেন তারা।
নেত্রকোনার কৃষক সবুজ সরদার যখন বৃষ্টিতে ধান কাটার সমস্যার কথা বলছিলেন, তখন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সতর্কবার্তার তথ্য বলছে, এই জেলাটিসহ দুইটি জেলায় বন্যা চলছে। নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজার এই দুই জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে এবং অবনতিও হতে পারে।
একইসঙ্গে, আরো তিন জেলা হবিগঞ্জ, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার সতর্কতার কথা জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাসমূহের তথ্যের বরাত দিয়ে, এই অঞ্চলে আগামী তিন দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে বলে জানিয়েছে এই কেন্দ্র।
এরইমধ্যে, হাওরাঞ্চলে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার করার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে একটি সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান তিনি।
এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বুধবার প্রধানমন্ত্রী জানান, তিন দিন আগে আবহাওয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তিনটি জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
একইসঙ্গে সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
"এসব এলাকার যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের ফসল নষ্ট হয়েছে, তাদের লোকেট করে আগামী তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করবো," সংসদ অধিবেশনে জানান প্রধানমন্ত্রী।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

কৃষকদের কষ্ট, শঙ্কা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
নেত্রকোনার কৃষক সবুজ সরদার বেশ আক্ষেপ নিয়েই বলছিলেন, একে তো বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে ধান, তার ওপর রোদের দেখা না পাওয়ায় কেউ কাটলেও ধান শুকানোর কোনো উপায় নেই। ফলে এখন ধান কাটছেন না কেউ।
"বৃষ্টির জন্য তো কাজ করতে লোক পাইতাছি না। ধান পাইক্কা গেছে, অহন গাড়িও আইতে ফারতাছে না। কিছু কাটছি, আর এইডি সব রইয়া গেছে," বলেন এই কৃষক।
"মানুষে যে তুলবো ধান, কেমনে পইড়া রইছে (পানির নিচে) কী অবস্থায়। নিতেই পারে নাই। নিয়া কিতা করবো, হুগাইতে পারে না। বুঝেন না," বলেন মি. সরদার।
হাওরভিত্তিক এই জেলার আরেকটি উপজেলা খালিয়াজুড়ি উপজেলার কৃষক ওসমান শেখও বোরো ধান নিয়ে নিজের দুর্দশার কথা জানান।
মি. শেখ জানান, মোট ১২১ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন তিনি। বৃষ্টি শুরু হতে পারে, তাই বোরো ধান কাটার জন্য সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
"কিন্তু মার্চের শুরুর থাইকাই তো বৃষ্টি হইতাছে। শিলাবৃষ্টিও পড়ছে, ঠাডাও (বজ্রপাত) পড়তাছে। এখন আবার কয়দিন ধইরা চলতাছে (বৃষ্টি)...। সব ধান তো কাটতে পারি নাই," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. শেখ।
এখনো ৮৫ বিঘার ধান কাটা বাকি রয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
হতাশা প্রকাশ করে এই কৃষক বলেন, "যেগুলা পানির তলে গেছেগা, চাইছিলাম কাটতে (ধান)। কিন্তু লোক লাগাইয়া খরচ কুলাইতে পারি নাই।"
এদিকে, বন্যার ঝুঁকিতে থাকা জেলা সুনামগঞ্জের কৃষকরাও এমন দুর্দশার মধ্যে পড়েছেন।
এই জেলার মাটিয়ান হাওরের কৃষক শফিউল্লাহ মিয়া বলেন, "২৬ তারিখ থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড নতুন করে সতর্কতা দিছে। হাওরের ধান কাটি ঘরে নেবার জন্য। কিন্তু যেই বৃষ্টি শুরু হইছে, ধান কাটাও এখন আমাদের জন্য কষ্ট হয়ে পড়ছে।"
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যাচ্ছে যে, বোরো ধান কাটার সময়ে এবার প্রথমে বৃষ্টি, পরে শিলাবৃষ্টি, এরপর কয়েকদিনের অতিবৃষ্টি এবং এখনকার ভারী বৃষ্টিসহ চার দফার বৃষ্টির কারণে তাদের বেগ পোহাতে হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ফসলের জন্য কতটা সমস্যা তৈরি করতে পারে এই বৃষ্টি?
হাওরাঞ্চলে সাধারণত অন্যান্য স্থানের থেকে এক মাস আগে বোরো ধানের চারা রোপন ও কাটা হয়।
এই অঞ্চলে ২০শে নভেম্বরের কিছুটা আগে-পরে বীজ বপন শুরু হয়। এরপর ২৫শে ডিসেম্বর থেকে ৩০শে ডিসেম্বর পর্যন্ত চারা রোপন করা হয়।
এরপর ধান কাটা শুরু হয় মোটামুটি ১৫ই এপ্রিলের আগে-পরে এবং তা চলে ১৫ই মে'র কাছাকাছি সময় পর্যন্ত।
নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, তার উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর ফসলি জমি রয়েছে, যাতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে।
"গতকালকে পর্যন্ত ৫১ শতাংশ জমি, অর্থাৎ ১০ হাজার ৪৬২ হেক্টর জমির ধান কেটেছি আমরা। বিভিন্ন হারভেস্টারদের দিয়ে কর্তন করেছি। কিন্তু গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে ধান কাটা স্থগিত আছে। মেশিন কাজ করতে পারছে না, শ্রমিকরাও কাটতে পারছে না," বলেন মি. হোসেন।
গত দুই-তিনদিনের বৃষ্টিতে বেড়িবাঁধের ভেতরের প্রায় দুই হাজার ৭৮০ হেক্টর জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।
বাকি জমির মধ্যে প্রায় তিন হাজার ৮৫১ হেক্টর জমির ধান ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
কেবল এই একটি উপজেলাতেই মোট আবাদী জমির ১৯ শতাংশ ক্ষতির মুখে পড়েছে যার সম্ভাব্য আর্থিক মূল্য ১০৪ কোটি টাকা বলে দাবি করেন মি. হোসেন।
পানির নিচে থাকা ধানের জন্য কৃষকদের যে আহাজারি, তার সমর্থনে এই কৃষি কর্মকর্তাও জানান, ওই ধান আসলে নষ্ট হয়ে যাবে।
মি. হোসেন বলেন, "যেসব জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে, সেই পানি কমার সম্ভাবনা নেই। কারণ নদীর পানিও বাড়ছে এবং বাঁধের ভেতরে বৃষ্টির পানি সেটাও যাওয়ার রাস্তা নেই। আলটিমেটলি পাঁচ-সাত দিন এটা পানির নিচে থাকলে ডিকম্পোজ বা নষ্ট হয়ে যাবে।"
আবার পানির নিচের ধান কেটে আনতে যে শ্রমিক খরচ হবে, সেটি ধান বিক্রি করে পোষাবে না বলেও উল্লেখ করেন কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন।
এদিকে, নেত্রকোনা জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে এই জেলার প্রায় চার হাজার ৭১২ হেক্টর জমি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
"সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, আমাদের হাওরের ৬৫ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে। আর টোটাল জেলা যদি বলি, তাহলে আমাদের প্রায় ২২ শতাংশ বোরো ধান কাটা হয়েছে," বলেন মি. ইসলাম।
এই জেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, গত ১৪ই মার্চ থেকে বৃষ্টি, দুই ধাপে শিলাবৃষ্টি, ২৮শে মার্চে অতিবৃষ্টি এবং গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির ফলে বোরো ধান ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
"তিনধাপ এবং এই ধাপ সব মিলিয়ে আমাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা," বলেন নেত্রকোনা জেলার কৃষি কর্মকর্তা।
এদিকে, বন্যা ঝুঁকিতে থাকা সুনামগঞ্জ জেলার কৃষি অফিসের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, এই জেলায় হাওর ও উজান এলাকা মিলিয়ে প্রায় ৪৬ শতাংশ বোরো ধান এরইমধ্যে কাটা হয়েছে।
"মোট আবাদী জমির মাত্র দুই শতাংশ এই বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. ফারুক।
আর চার থেকে পাঁচদিন রোদ পেলে বাকি ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পুরো বিষয়টিই আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "যদি আবহাওয়া ভালো হয়ে যায়, তাহলে তো আমরা শঙ্কামুক্ত।"
একইসঙ্গে, দেশের ভেতরে বৃষ্টি হচ্ছে এবং যদি ভারত থেকেও বৃষ্টির পানি বা ফ্ল্যাশফ্লাড আসে তাহলে বিপদ আরো বাড়বে বলে জানান তিনি।
End of বিবিসি বাংলার আরো সংবাদ

বন্যার পূর্বাভাস
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বুধবার দুপুরে এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নেত্রকোনায় ১২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এই বৃষ্টি অতিভারী বৃষ্টিপাতের আওতায় পরে। অর্থাৎ, এই জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে মাঝারি-ভারী থেকে ভারী এবং অভ্যন্তরে হাওর অববাহিকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে, বলছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র।
নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার নদীগুলোর পানি আগামী তিনদিন বাড়তে পারে পূর্বাভাস দিয়ে এই কেন্দ্র জানিয়েছে, নেত্রকোনা জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
একইসঙ্গে নদীর পানি মৌলভীবাজারের হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এবং হবিগঞ্জ জেলায়ও বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এছাড়া আগামী তিন দিন সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়তে পারে ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।







