ইসরায়েলে চরম দক্ষিণপন্থীদের উত্থানে ফিলিস্তিনিরা আতঙ্কে

হেব্রনে এক বসতিতে ইসরায়েলি সেনার সঙ্গে কথা বলছেন এক ফিলিস্তিনি নারী (ফাইল ফটো)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইসরায়েলে চরম দক্ষিণপন্থী ও বসতি সমর্থক নতুন সরকার শপথ নেবার পর পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক প্রতিদিন বাড়ছে

ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে কট্টরপন্থী এবং গোঁড়া ধর্ম-ভিত্তিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর ইসরায়েল - ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব আরও সংঘাতময় হয়ে উঠবে বলে ইসরায়েলের ভেতর এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যেই প্রবল শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা। এই পটভূমিতে হেব্রনে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কথা বলেছেন বিবিসি নিউজের টম বেইটম্যান। কী দেখেছেন তিনি?

ইয়াসের আবু মারখিয়ার ও তার পরিবারের সদস্যরা

ছবির উৎস, Lee Durant

ছবির ক্যাপশান, ইয়াসের আবু মারখিয়ার (বামে) ও তার পরিবারের সদস্যরা যখন বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন তখন ইহুদী বসতিস্থাপনকারীরা তার বাগানে আচমকা ঢুকে পড়ে হামলা চালায়

আমি গিয়েছিলাম হেব্রনে ইয়াসের আবু মারখিয়ার বসতবাড়ির ওপর চালানো হামলা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু সাক্ষাৎকারের মধ্যেই কুঁচকিতে লাথি খেয়ে বাগানে তাকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে হল।

তার বাড়িতে হামলা চালানো যখন শুরু হয়, তখন আমাদের ক্যামেরা ওই ঘটনা রেকর্ড করতে শুরু করেছে।

“বসতিস্থাপনকারীরা হামলা শুরু করেছে! তারা পাথর ছুঁড়ছে! আমার প্রযোজক চিৎকার করছিলেন।

ফিলিস্তিনি পরিবারটির সদস্যদের সঙ্গে আমরা ছুটে বাসার বাইরে গেলাম। দুজন তরুণ ইসরায়েলি, ইয়াসের আবু মারখিয়ার বাসার বাগানে জোর করে ঢুকে পড়েছে। তাদের পেছন পেছন ঢুকেছে কিছু সৈন্য।

দুই তরুণ বসতিস্থাপনকারীর একজন সোজা আমাদের দিকে তেড়ে এল- পরিবারটিকে উদ্দেশ্য করে চেঁচাতে লাগল: “এখান থেকে বেরিয়ে যাও। চলে যাও!”

তাদের হম্বিতম্বি থামানোর চেষ্টায় মি. আবু মারখিয়া এগিয়ে গেলেন- তিনি তার ফোনে ঘটনাটার ছবি তুলছিলেন। একজন সৈন্য তাকে ছবি তুলতে বাধা দিল। কিন্তু এরই মধ্যে ইসরায়েলি তরুণটি এগিয়ে এসে ওই বাসার মালিক ফিলিস্তিনি মি. আবু মারখিয়াকে জোরে লাথি মারল।

ঠিক এধরনেরই আচমকা হামলা নিয়ে এই পরিবারটির সঙ্গে কথা বলতে আমরা হেব্রনে এসেছিলাম।

হেব্রনের ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা বলছেন, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর তাদের ওপর হামলা ক্রমশ বাড়ছে। তারা সবসময় আচমকা হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

একজন তরুণ ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) মি. আবু মারখিয়াকে (ডানে) লাথি মারে।

ছবির উৎস, LEE DURANT

ছবির ক্যাপশান, একজন তরুণ ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) মি. আবু মারখিয়াকে (ডানে) লাথি মারে। তাদের মাঝখানে মধ্যস্থতার চেষ্টায় একজন ইসরায়েলি সৈন্য
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এবারের ভোটে চরম ডানপন্থীদের প্রতি সমর্থন ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। যার ফলে হেব্রন এবং অন্যত্র ইহুদী বসতিস্থাপনকারীদের পক্ষে আন্দোলনকারী চরম জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠির একেবারে কট্টর মনোভাবাপন্ন মানুষরা নিজেদের ক্ষমতাশালী মনে করছেন।

এছাড়া এই ভোটের ফলাফল, অধিকৃত এলাকাগুলোয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে ইসরায়েলি সমাজের ভেতর একটা সংস্কৃতির লড়াইয়েও ইন্ধন জোগাচ্ছে।

মি. আবু মারখিয়াকে লাথি মারা ঘটনার পর আমরা যখন ছবি তোলা চালিয়ে যাচ্ছি, তখন সেখানে একটা অচলাবস্থার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ওই পরিবারকে সাহায্য করছেন এমন একজন ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারী, বাদি দোওয়েক, চিৎকার করতে থাকেন: “এখানে সৈন্যরা ফিলিস্তিনিদের রক্ষার জন্য কিছুই করে না। একজন ফিলিস্তিনি যদি একাজ করতো, তাহলে তোমরা (সৈন্যরা) তাকে জেলে ধরে নিয়ে যেতে, নয়ত গুলি করতে!”

সেখানে এই পদ্ধতিমাফিক বৈষম্যের যে অভিযোগ অনবরতই শোনা যায় সেটাই ওই ব্যক্তি পুনর্ব্যক্ত করলেন। তাদের চিরাচরিত অভিযোগ হল: অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি গাড়তে আসা ইসরায়েলি, যারা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালায়, তাদের দায়বদ্ধ করার সংস্কৃতি খুবই বিরল।

আর তাদের এই অভিযোগ যে কতটা সত্যি সেটাই প্রমাণ করলেন ওই ব্যক্তি, যিনি ইয়াসের আবু মারখিয়াকে লাথি কষিয়েছিলেন। তিনি তার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন, একজন সৈন্য তার সাথে করমর্দন করল এবং তিনি চলে গেলেন।

ইসরায়েলি একজন সৈন্য বিবিসির ক্যামেরার লেন্সের ওপর হাত দিয়ে ছবি তুলতে বাধা দেন

ছবির উৎস, Lee Durant

ছবির ক্যাপশান, মি. আবু মারখিয়াকে একজন ইসরায়েলির লাথি মারার ঘটনা ভিডিও করার সময় ইসরায়েলি একজন সৈন্য বিবিসির ক্যামেরার লেন্সের ওপরও হাত দিয়ে ছবি তুলতে বাধা দেন

মি. আবু মারখিয়া অচৈতন্য আর আহত অবস্থায় পড়ে রইলেন। প্রতিবেশিরা এসে তার সেবা শুশ্রূষা করতে লাগল।

এই ঘটনা নিয়ে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আমরা প্রশ্ন করলে তারা বলে যে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা হলে সেটা থামানোর দায়িত্ব সৈন্যদের এবং প্রয়োজন হলে পুলিশ না আসা পর্যন্ত সন্দেহভাজনদের আটক রাখার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে।

পুলিশও নিয়মমাফিক বলে থাকে, ইহুদী বসতিস্থাপনকারীদের দিক থেকে সহিংসতার ঘটনা ঘটলে তারা তা তদন্ত করে। কিন্তু অধিকার গোষ্ঠিগুলো বলে, এগুলো সাধারণত কেবল মুখের কথা, আদতে কখনই এসব ঘটে না।

ইসরায়েলি তরুণ যিনি মি. আবু মারখিয়াকে লাথি মেরেছিলেন, তার সাথে করমর্দন করছে একজন ইসরায়েলি সেনা

ছবির উৎস, LEE DURANT

ছবির ক্যাপশান, ইসরায়েলি তরুণ যিনি মি. আবু মারখিয়াকে লাথি মেরেছিলেন, তার সাথে করমর্দন করে তাকে ছেড়ে দেয় সৈন্যরা

প্রান্তিক থেকে মূলধারায়

ইসরায়েলে নভেম্বরে যে নির্বাচন হয়েছে তাতে উগ্র-দক্ষিণপন্থী দল রিলিজিয়াস জায়োনিজম জোট সংসদের ১২০টি আসনের মধ্যে ১৪টি আসনে জয়লাভ করেছে। নব-নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বিনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোটের দ্বিতীয় সবচেয়ে শক্তিশালী শরিক জোট এরাই।

নতুন সম্প্রসারিত জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রীর পদে নিয়োগ করা হয়েছে ইতামার বেন-গ্যভিরকে। ইসরায়েল এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে পুলিশি ব্যবস্থার দায়িত্বও এখন এই পদের অধীনে আনা হয়েছে।

মি. বেন-গ্যভির চরম জাতীয়তাবাদী এবং ইহুদী-বসতি সমর্থক দল ওৎজমা ইয়েহুদিৎ-এর নেতা, যে দল আরব-বিরোধী এবং বৈষম্যমূলক নীতির প্রচারক।

তরুণ জাতীয়তাবাদী ও ধর্মভিত্তিক একটি গোষ্ঠি, যারা রাস্তায় বন্দুক হাতে আন্দোলনের সমর্থক, “আনুগত্যহীন” আরবদের ইসরায়েল থেকে বের করে দেবার আহ্বানে মুখর এবং পাথর নিক্ষেপকারী ফিলিস্তিনিদের গুলি করার মতবাদে বিশ্বাসী, তাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন এই ইতামার বেন-গ্যভির।

ওৎজমা ইয়েহুদিৎ-এর নেতা ইতামার বেন-গ্যভির

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ইসরায়েলের পুলিশ বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ইতামার বেন-গ্যভির আরব বিরোধী বর্ণবাদী আচরণের দায়ে আগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন

মি. বেন-গ্যভির, বর্ণবাদে উস্কানি দেবার ঘটনায় এবং ইহুদী একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠিকে সমর্থন করার দায়ে আগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং হেব্রনের ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের কাছে তিনি সুপরিচিত, কারণ শহরের একটি ইহুদী বসতি থেকেই তার উত্থান।

গোঁড়া একটি প্রান্তিক গোষ্ঠি থেকে দেশটির রাজনৈতিক মূলধারায় তার উত্থানকে অনেকেই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে একটি বিপজ্জনক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসাবে দেখছেন। বিশেষ করে, পশ্চিম তীরে ইতোমধ্যেই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী যেভাবে ব্যাপক ধরপাকড়ের অভিযান চালাচ্ছে এবং সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের দিক থেকেও মারাত্মক হামলা যেভাবে বেড়েছে, সেই পটভূমিতে।

এ বছর হেব্রনে, ১৬ বছরের একজন তরুণসহ দুজন ফিলিস্তিনিকে শহরে প্রতিবাদ বিক্ষোভের সময় গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সৈন্যরা। ইসরায়েলি সেনাদের ওপর ছুরি নিয়ে হামলার অভিযোগ তুলে আরও দুজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। একজন ফিলিস্তিনির চালানো বন্দুক হামলায় নিহত হয়েছে একজন ইসরায়েলি, যে ফিলিস্তিনিকে পরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

যেদিন আমরা খবরের জন্য ফিল্ম করছিলাম, সেদিন শহরে দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শহরে ঘুরছিলেন ইসরায়েলের শান্তিকামী কিছু দলের প্রতিনিধিরা।

ওৎজমা ইয়েহুদিৎ দলের সমর্থকরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নভেম্বরের নির্বাচনে ইসরায়েলে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনপ্রিয় সমর্থন দেখা গেছে

‘সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু’

হেব্রন শহর হল তল্লাশি চৌকির শহর আর অধিকৃত এলাকায় সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে রয়েছে কয়েকশ ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীর ঘর, যারা বাস করে সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় এবং পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে। তাদের ঘিরে বসবাস কয়েখ লাখ ফিলিস্তিনির, যাদের না আছে নিরাপত্তা সুরক্ষা, না আছে কোন অধিকার।

অনেকেই মনে করেন ফিলিস্তিনি এই ভূখণ্ডে এটা ইসরায়েলি দখলদারির চরম নিদর্শন।

ঐতিহাসিক এই শহর কেন্দ্রের রাস্তায় চোখে পড়ে বেসামরিক মানুষের অনেক বসতবাড়ি আর দোকানপাটের দরজায় কুলুপ আঁটা- সামরিক বেড়া , দেয়াল আর নজরদারি টাওয়ার দিয়ে সেগুলো ঘেরা। একসময় ফিলিস্তিনিদের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এই এলাকায় এখন শুধু অনুমতি সাপেক্ষে ঢুকতে পারেন বাসিন্দারা।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যুক্তি এলাকাটিকে “নিষ্কলুষ” রাখতে নিরাপত্তার প্রয়োজনেই এই ব্যবস্থা।

হেব্রন ইসরায়েলি কট্টর দক্ষিণপন্থীদের মূল রাজনৈতিক ঘাঁটি। সেখানে যেসব ইসরায়েলি বসতি নির্মাণ করে আছেন, তারা মি. বেন-গ্যভির এবং আরেকজন উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক বেজালেল স্মটরিচের যৌথ নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতি নির্বাচনে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছে।

মি. স্মটরিচকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অর্থ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে এবং সেখানে ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন আর্থিক বিষয়গুলো তিনিই দেখভাল করবেন।

ইসরায়েলের দক্ষিণপন্থী সমর্থকরা

ছবির উৎস, Lee Durant

ছবির ক্যাপশান, নভেম্বরের নির্বাচনে কট্টর দক্ষিণপন্থীদের প্রতি ভোটারদের সমর্থনে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে

'আরবরা মরুক'

ইসরায়েলের শান্তিকামী অধিকারকর্মীরা পশ্চিম তীরে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের পর ফিলিস্তিনিদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে সেখানে যান।

নির্বাচনের পরের কয়েক সপ্তাহে সেখানে তরুণ ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরের ওপর হামলা চালিয়েছে। এমনকী ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের সমর্থনে সেখানে সফররত একজন বামপন্থী ইসরায়েলি অধিকার কর্মীকে মারধর করেছে একজন ইসরায়েলি সৈন্য। একজন সৈন্যকে দেখা যায় এক ভিডিও বার্তায় মি. বেন-গ্যভিরের প্রশংসা করে বলছেন, তিনিই এই এলাকাকে ঠাণ্ডা রাখার উপযুক্ত ব্যক্তি।

ওই এলাকায় জাতিসংঘের দূত টর ওয়েনেসল্যান্ড সেখানে সহিংসতার নিন্দা করেছেন। ইসরায়েলের বিদায়ী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বেনি গানৎজও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, মি. বেন-গ্যভির দেশে আগুন জ্বালানোর ঝুঁকি তৈরি করছেন।

নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় যাদের ঘরবাড়ির ওপর হামলা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন মি. আবু মারখিয়া এবং তার প্রতিবেশি ইমাদ আবু শামসিয়েহ।

তারা দুজনেই গত কয়েক বছর ধরে ফিলিস্তিনি একটি মানবাধিকার সংগঠনের হয়ে কাজ করেছেন এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করেছেন।

অনেকেই মনে করছেন সে কারণেই তাদের ওপর এখন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

“এখানে দাঁড়িয়ে ইহুদি তরুণরা আমাদের দিকে পাগলের মত পাথর ছুঁড়েছে, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে আমাদের অভিশাপ দিয়েছে, বর্ণবাদী মন্তব্য করেছে, বলেছে: ‘আরবরা মরুক’ বলেছে ‘বেরিয়ে যাও এখান থেকে। এসব ঘরবাড়ি আমাদের, আমরা সব কেড়ে নেব’,” আমাকে বললেন মি. আবু শামসিয়েহ।

তিনি বলছিলেন, বসতিস্থাপনকারীরা বিপুল সংখ্যায় এসেছিল। “আমার নিজের জন্য, স্ত্রীর জন্য আর বাচ্চাদের জন্য ভয় করছিল।”

হেব্রনের একটি বন্ধ রাস্তা

ছবির উৎস, Lee Durant

ছবির ক্যাপশান, ইসরায়েলি সেনবাহিনী তল্লাশি চৌকি আর পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বসিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হেব্রনের একটি বন্ধ রাস্তা।

মি. আবু মারখিয়া বলছিলেন: “ইসরায়েলে নির্বাচনের পর, আমাদের ওপর হামলা বেড়েছে এবং হামলা আগের চেয়ে অনেক তীব্র হয়েছে।”

মি. বেন -গ্যভিরের প্রশংসা করে ভিডিও তোলা সৈনিককে পরে কয়েকদিনের জেল দেয়া হয়েছিল। তবে তার কারাবাস নিয়ে ইসরায়েলে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। জাতীয়তাবাদীরা যুক্তি দিয়েছেন সামরিক বাহিনীর নেতারা উদারপন্থীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে দেশের সুরক্ষায় নিবেদিত-প্রাণদের শাস্তি দিচ্ছেন।

‘চাপা আগুন উস্কে উঠেছে’

ইসরায়েলি সমাজের ভেতর বিষয়টি নিয়ে বহুদিনের যে টানাপোড়েন রয়েছে অধিকৃত হেব্রনের পরিস্থিতি সেই চাপা আগুনকে আবার উস্কে দিয়েছে।

শহরে দেখেছি পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ সমাবেশ আর উত্তেজনা - বসতি নির্মাণের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি শান্তিকামীদের আন্দোলন – আবার তাদের বিরুদ্ধে বসতি সমর্থকদের মিছিল সমাবেশ।

ইশাই ফ্লেইশার বসতি নির্মাণকারীদের অধিকারের পক্ষে। তিনি নিজেকে পরিচয় দেন হেব্রনের ইহুদীদের আন্তর্জাতিক মুখপাত্র হিসাবে। হেব্রন সফরে যাওয়া ইসরায়েলের শান্তিকামী কর্মীদের বিরুদ্ধে তার সমর্থকদের স্লোগান ছিল - তারা “বিশ্বাসঘাতক”।

“এই ছোট ভূখণ্ডটা আমাদের - উত্তরাধিকার পরম্পরায় এই ভূখণ্ড আমাদের। এর ওপর অবশ্যই আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। কারণ এই ভূখণ্ড আমাদেরই,” তিনি আমাকে বললেন।

এ মন্তব্য "বর্ণ বিদ্বেষী" আমার এমন কথা তিনি নাকচ করে দিলেন।

ইসা আমরো ফিলিস্তিনি আন্দোলন কর্মী

ছবির উৎস, LEE DURANT

ছবির ক্যাপশান, ইসরায়েলের শান্তি আন্দোলনকর্মীরা যারা হেব্রন সফরে গিয়েছিলেন তাদের উদ্দেশ্যে এক জমায়েতে বক্তৃতা দেবার পর গ্রেপ্তার হন ফিলিস্তিনি আন্দোলন কর্মী ইসা আমরো

অধিকৃত পশ্চিম তীরে থাকেন প্রায় ৩০ লক্ষ ফিলিস্তিনি।

ইহুদীদের বসতি এলাকায় বাস করেন প্রায় পাঁচ লাখ ইসরায়েলি। ইহুদী বসতিতে বসবাসকারী সবাই আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বলে বিবেচিত, যদিও ইসরায়েল তা মানে না।

ইসা আমরো সুপরিচিত ফিলিস্তিনি আন্দোলনকর্মী এবং বসতি বিরোধী তরুণদের আন্দোলন গোষ্ঠি ইয়ুথ এগেনস্ট সেটেলমেন্টস-এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ইসরায়েলি বাহিনী এবং প্যালেসটিনিয়ান অথরিটি উভয়েরই প্রকাশ্য সমালোচক। দুপক্ষের হাতেই তিনি বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

জাতিসংঘ এবং ইউরোপিয় ইউনিয়ন তাকে মানবাধিকার রক্ষাকর্তা বলে মনে করে এবং বারবার তাকে গ্রেপ্তার করার নিন্দা তারা করেছে।

যেসব ইসরায়েলি অধিকারকর্মী শান্তির পক্ষে, তাদের হেব্রন সফরের সময় মি. আমরো বিভিন্ন সমাবেশে বক্তৃতা দিয়েছেন। কিন্তু এর ফলে তিনি এখন ঘর-ছাড়া বলে জানালেন আমাকে।

বিবিসি যখন তার সাক্ষাৎকার নিচ্ছে, তখন সাদা পোশাকে চারজন ইসরায়েলি পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে গেল। এদের মধ্যে একজন পুলিশ অফিসারকে আমরা আগে দেখেছিলাম। তিনি ইসা আমরোকে দেওয়ালের গায়ে দাঁড় করিয়ে তাকে তল্লাশি করলেন। তারপর বললেন, “ন্যায়বিচারে বাধা দেয়ার জন্য” তাকে আটক করা হলো।

আমরা বিবিসির জন্য যখন ছবি তুলছি তখন যেসব ইসরায়েলি আন্দোলনকর্মী, বা ঘরবাড়িতে হামলা হওয়া যেসব ফিলিস্তিনি পরিবারের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি, তাদের মতই মি. আমরোও বলছিলেন নভেম্বরের নির্বাচনের পর থেকে বসতি সমর্থকদের ক্ষমতার দাপট অনেক বেড়ে গেছে।

কিন্তু মাত্র ওইটুকুই তিনি বলতে পেরেছিলেন। কারণ সাক্ষাৎকারের মাঝপথে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে কিছুদিনের জন্য তার মুখ বন্ধ থাকে।