তীব্র গরমে এবার মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা

গরমে পানিতে ভিজছে এক শিশু

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দেশব্যাপী বয়ে যাচ্ছে তীব্র তাপ প্রবাহ

বাংলাদেশে চলমান তাপ প্রবাহের কারণে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৮ই জুন) মাধ্যমিক পর্যায়ের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

দেশব্যাপী তীব্র গরমের কারণে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রাথমিক শাখার ক্লাস ৫ থেকে ৮ই জুন পর্যন্ত মোট চার দিন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আসে গত রবিবারেই।

আর আজ এক বিজ্ঞপ্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) জানিয়েছে, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ‘তাপ প্রবাহের সতর্কবার্তা’য় বলেছে আগামী পাঁচ থেকে ছয় দিন দেশের ওপর দিয়ে চলমান মৃদু, মাঝারি এবং তীব্র তাপ প্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে।

এই তাপ প্রবাহের সতর্কবার্তার কারণে দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম আগামী ৮ই জুন (বৃহস্পতিবার) বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

গত কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই বয়ে যাচ্ছে তীব্র তাপ প্রবাহ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বার্তায় এই তীব্র গরম কমার কোনও আশু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তাপপ্রবাহ চলমান থাকতে পারে বলে জানাচ্ছেন আবহাওয়াবিদরা।

তীব্র গরম আর লোডশেডিংয়ে জনজীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। নানান স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বলে জনগণকে বিভিন্নভাবে সচেতন করার চেষ্টাও করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এসব ঝুঁকির কথা বিবেচনা করেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়তে পারেন:
শিক্ষার্থীরা ছাতা মাথায় হেঁটে যাচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তীব্র গরমে রাস্তায় বের হলে ছাতা ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

প্রাকৃতিক দুর্যোগ?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন হয় বা সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেয়, তাপ প্রবাহ নিয়ে মানুষের মধ্যে সেই পরিমাণ সচেতন নেই।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দে কয়েকদিন আগে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “তাপ প্রবাহ অবশ্যই বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কারণ এখানে জীবনের ঝুঁকি আছে। সরাসরি ওটার প্রভাব দেখা যায় না বলে জনগণ উদ্বিগ্ন কম থাকে। এটার প্রভাব কিন্তু আছে। স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি আছে”।

সতর্ক থাকার পরামর্শ

অতিরিক্ত তাপমাত্রা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যে তাপ প্রবাহ বাংলাদেশে চলমান তাতে হিট স্ট্রোকের আশঙ্কাও বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি।

এই তীব্র গরমে তাই তাদের সচেতন ও নিরাপদে থাকাটা খুবই জরুরি।

প্রচুর পানি পান করা, ঢিলেঢালা পোশাক পর, বাইরের রোদে বেশি সময় না থেকে ছায়ায় অবস্থান করা, রোদে যাবার প্রয়োজন পড়লে ছাতা ব্যবহার করাসহ নানা ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাপমাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যাবার আশঙ্কা

গত মাসেই বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে অতি উত্তপ্ত এই বিশ্ব আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তাপমাত্রা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাদের মতে ২০২৭ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে ৬৬ শতাংশ।

মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন হচ্ছে এবং চলতি বছরের গ্রীষ্মকালে আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা তা থেকেই এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বে তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা যাবে।

গরমে মাথায় পানি দিচ্ছেন রাস্তা দিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তীব্র গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

প্রতি বছর বিশ্বের তাপমাত্রা এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলে এবং এক বা দুই দশক ধরে এটা চলতে থাকলে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি মারাত্মক প্রভাব দেখা যাবে। যেমন-দীর্ঘ সময় ধরে তাপপ্রবাহ থাকা, মারাত্মক ঝড় ও তীব্র দাবানল দেখা যাবে।

গত বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যকার গড় তাপমাত্রার চেয়ে এক দশমিক ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রমের অর্থ হলো- ১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের তুলনায় পৃথিবী এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উষ্ণ হয়ে উঠবে।

গত কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে বিশ্বের তাপমাত্রা যদি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমায় পৌঁছে যায় তাহলে তার ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়বে। কিন্তু ২০১৮ সালে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেই তা বিশ্বের জন্য ভয়াবহ হবে।

পানি খাচ্ছেন এক ব্যক্তি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অতিরিক্ত তাপ প্রবাহে বাইরে বেশি সময় থাকার প্রয়োজন হলে কিছুক্ষণ পরপর পানি খাওয়ার পরামর্শ বিশেজ্ঞদের।

গত কয়েক দশক ধরে আমাদের বিশ্ব উত্তপ্ত হচ্ছে। ২০১৬ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ছিল ১.২৮ সেলসিয়াস যা শিল্পায়নের আগে বিশ্বের যে তাপমাত্রা ছিল সেই তুলনায় অনেক বেশি।

এখন গবেষকরা বলছেন যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ওই সীমাও ছাড়িয়ে যাবে- তারা ৯৮% নিশ্চিত যে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা সীমা অতিক্রম করবে।

গবেষকরা বলছেন বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হবে আগামী ২০ বছর, প্যারিস চুক্তিতে যেমনটা বলা হয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিল্প বিপ্লব শুরুর আগে বিশ্বের যে তাপমাত্রা ছিল তার থেকে বৃদ্ধির মাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা গেলে বড় ধরণের বিপদ এড়ানো যাবে। তা না পারলে বিপজ্জনক হয়ে পড়বে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন।