মিরপুরের বিহারি ক্যাম্পের একটি বাসায় সেনা অভিযানে কী ঘটেছিল?

সোমবার রাতে সেনা সদস্যদের একটি দল মিরপুরের ইরানি ক্যাম্পের একটি বাড়িতে অভিযান চালায়

ছবির উৎস, CCTV CAMERA FOOTAGE/ COLLECTED

ছবির ক্যাপশান, সোমবার রাতে সেনা সদস্যদের একটি দল মিরপুরের ইরানি ক্যাম্পের একটি বাড়িতে অভিযান চালায়
    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের ঢাকার প্রায় ১২ বছর আগে পুলিশ হেফাজতে নিহত হওয়া একজন ব্যক্তির ছোট ভাইকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা কয়েক ঘণ্টার জন্য ধরে নিয়ে সামনে অস্ত্র রেখে ছবি তোলা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

মিরপুর এলাকার বিহারি ক্যাম্প নামে পরিচিত ইরানি ক্যাম্পের নিজ বাসা থেকে ইমতিয়াজ হোসেন রকি নামের একজন ব্যক্তিকে সোমবার রাতে আটক করে নিয়ে যায় সেনা সদস্যরা।

যাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল সেই ইমতিয়াজ হোসেন রকি, বারো বছর আগে ২০১৪ সালে পল্লবী থানায় পুলিশের হেফাজতে নিহত ইশতিয়াক হোসেন জনির ছোট ভাই। সেই সময় ইমতিয়াজ হোসেনকেও পুলিশ সদস্যরা আটক করে নির্যাতন করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন প্রণয়নের পর বাংলাদেশে সেটাই প্রথমবারের মতো পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর কোনো ঘটনায় মামলার রায়।

ভুক্তভোগী ইমতিয়াজ হোসেন রকি বিবিসি বাংলার কাছে দাবি করেন, "দারুস সালাম সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পর একটা কাগজে সই করতে বলে। পরে একটি টেবিলের সামনে অস্ত্র রেখে আমার ছবি তুলে রাখছে।"

ওই অস্ত্রটি নিজের না হওয়ায় সেটির সামনে ছবি তুলতে অপরাগতা প্রকাশ করলে ১০ মিনিট সেনা সদস্যদের সাথে বাদানুবাদ হয়েছে বলেও দাবি করেন মি. রকি।

তার বাড়ির অদূর থেকে একটি পিস্তল গুলিসহ উদ্ধার করার তথ্য জানিয়েছে সেনা সদস্যরা।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তিনি জানান, মিরপুর - ১ এ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে অবস্থিত একটি সেনা ক্যাম্পে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে দুই ঘণ্টার বেশি সময় পর মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এদিকে, ভাইয়ের মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য রোববার একটি আবেদন করেছেন। ফলে আসামিদের ভয়ে নিরাপত্তাহীনতায় আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানান তিনি।

সোমবার রাতে সেনা সদস্যরা সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগে মি. রকির বাসায় অভিযান চালিয়েছিল কি না এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) কাছে জানতে চেয়েছিলো বিবিসি বাংলা।

একইসাথে অস্ত্র সামনে রেখে কেন ছবি তোলা হয়েছে এমন প্রশ্নও আইএসপিআরের কাছে করা হয়েছিল।

"অস্ত্র সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে মেইনলি তার বাসায় একটা অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরবর্তীতে তার বাসার বাইরে থেকে একটা অস্ত্র দুই রাউন্ড অ্যামিউনিশনসহ উদ্ধার হয়। পরে যিনি তদন্তকারী কর্মকর্তার মনে হয়েছে এবং সন্দেহ হয়েছে, এই অস্ত্রটা তার কি না? বাকিটা প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। এজন্য মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বাকি ইনভেস্টিগেশনটা পুলিশ করবে" জানিয়েছে আইএসপিআর।

এদিকে, এমন ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

তারা বলছেন, সেনাবাহিনীর সদস্যদের পল্লবীর এই অভিযানে আইনি ব্যত্যয় ঘটেছে।

মোঃ ইমতিয়াজ হোসেন রকি।

ছবির উৎস, COLLECTED

ছবির ক্যাপশান, ইমতিয়াজ হোসেন রকির বিরুদ্ধে কোন মামলা করা হয়নি এবং তিনিও নির্যাতনের অভিযোগ করেননি

রকি যে বর্ণনা দিচ্ছেন

মিরপুরের এগারো নম্বর সেকশনের বি ব্লকে অবস্থিত মোহাম্মদীয়া মার্কেটের পেছনে অবস্থিত ইরানি ক্যাম্পে সপরিবারে বসবাস করেন ইমতিয়াজ হোসেন রকি। এই ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আটকে পড়া পাকিস্তানি বিহারিরা বসবাস করেন।

এই ক্যাম্পে সোমবার দিবাগত রাত প্রায় তিনটায় সেনাবাহিনীর একটি টিম তার বাসায় যান। সেখানে সার্চ করে পরে তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় দারুস সালামের সেনা ক্যাম্পে।

ইমতিয়াজ হোসেন রকির বাসার সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বাসার গেটের তালা খোলার পর সেনা সদস্যরা মি. রকির নাম জানতে চান। তিনি নাম বললে একজন সদস্য তার হাত ধরেন।

এ সময় রকির পেছনে পরিবারের সদস্যদের পরিচয় জানতে চান আগত সেনা সদস্যরা। তারা নিজেদের পরিচয় দেন। সেনা সদস্যরা ওই বাসা সার্চ করবেন বললে তারা রাজী হন।

এ সময় অন্তত ১০ থেকে ১২ জন সেনা সদস্য দোতলার ওই বাসায় প্রবেশ করেন।

পরে আবার কয়েকজনকে নিচে নেমে যেতে দেখা যায় সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে।

যে ফুটেজ বিবিসি বাংলা পেয়েছে তাতে এক পর্যায়ে শোনা যায়, রকির মা সোমবার তার ছেলে জনির মৃত্যুবার্ষিকী বলে জানাচ্ছেন সেনা সদস্যদের।

এ সময় সেনা সদস্যদের একজনের গলার শব্দ শোনা যায় যিনি ওই পরিবারের সদস্যদের ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে বলছেন।

ওই সেনা সদস্যকে বলতে শোনা যায়, আপনার নামটা বলেন, ক্যামেরার দিকে তাকান। বাবার নাম, ঠিকানা। তখন তারা নাম ও ঠিকানা জানান।

"আপনাদের বাসায় কারা আসছিলো, সেনাবাহিনীর দল আসছে। আমরা এসেছি, রকি, রকি আপনাদের কী হয়? ছোট ভাই। আপনার ছোট ভাইয়ের সম্পর্কে আমরা কিছু ইনফরমেশন পেয়েছি। সে কারণে আমরা এসেছি। আপনাদের বাসার ফুল সার্চ করি নাই, আমরা অল্প সার্চ করেছি।"

এ সময় ওই সেনা সদস্যকে তাদেরকে প্রশ্ন করতে শোনা যায়, "বাসায় কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে? কোন ধরনের জিনিস হারানো গিয়েছে বা নষ্ট হয়েছে? পরবর্তীতে বলতে পারবেন না সেনাবাহিনী এসে আপনাদের জিনিস নিয়ে গেছে।"

মি. রকির মাকে বলতে শোনা যায়, বাবা পুলিশ হেফাজতে মারা গেছে আমার ছেলেটা, জনি। ওই যে প্রথম হেফাজতের বিচার বাংলাদেশে হইছে।

পরে ইমতিয়াজ হোসেন রকিকে নিয়ে যান ওই সেনা সদস্যরা।

ওই বাসায় প্রবেশের আগে তারা সেখানে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা দেখতে পান এবাং লাঠি দিয়ে সেটি ভাঙার চেষ্টাও করেন বলে দেখা যায়।

ইমতিয়াজ হোসেন রকি বিবিসি বাংলাকে জানান, প্রধান সড়কে গিয়ে সেনা সদস্যদের পাঁচ-ছয়টি গাড়ি তিনি দেখতে পান। পরে পল্লবী থানা পুলিশকে অবহিত করলে ঘটনাস্থলে আসেন তারা।

সেখানে মি. রকির জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে তার বিরুদ্ধে কোন মামলা আছে কিনা সেটি যাচাই করে পুলিশ। কিন্তু কোন মামলার সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানান মি. রকি।

"পরে ওই পল্লবী থেকে তারা বললো যে একটা অস্ত্র উদ্ধার করছি। বলে এই অস্ত্র কার? আমি বলছি, আমি জানিনা কার এই অস্ত্র। আমি বলছি স্যার যেই আপনাদেরকে এই ইনফরমেশন দিয়েছে সেটা ভুল ইনফরমেশন। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। পরে মামলা পায় নাই তাই পুলিশ চলে গেছে" বিবিসি বাংলাকে বলেন ইমতিয়াজ হোসেন রকি।

পরে তাকে এলাকার দুইজন বড় ভাইসহ দারুস সালামের সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানান তিনি।

সেখানেই একটি টেবিলে অস্ত্র রেখে তার ছবি তোলা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে সেনা সদস্যদের সাথে বাদানুবাদ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পরে তার সাথে ক্যাম্পে যাওয়া ওই এলাকার দুইজনের একটি কাগজে সই নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানান মি. রকি।

তবে আইএসপিআর বলছে, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ইমতিয়াজ হোসেন রকির বাসায় অভিযান চালানো হয়েছি। তদন্তকারী কর্মকর্তার সন্দেহ হওয়ায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে মুচলেকা নিয়ে তাকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে, বাকিটা পুলিশ তদন্ত করবে।

হেফাজতের প্রতীকি ছবি।
ছবির ক্যাপশান, ২০১৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন প্রণয়নের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর কোনো ঘটনায় মামলার রায়ে তিন পুলিশ সদস্যসহ পাঁচজনকে সাজা দেওয়া হয়েছিল

'আইনকে পাশ কাটিয়ে মানুষকে হ্যারাস করা'

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, কেন, কি কি অবস্থায় এবং কোন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করতে পারবে সেটি বাংলাদেশের আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে।

পল্লবীর এই অভিযানে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আইনি ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন।

সেনা সদস্যদের সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

"অপারেশন করার আগে যদি যথাযথভাবে ক্রসচেক করে ভালো করে অনুসন্ধান করে অপারেশনটা করতো তাহলে ভিকটিমের এই ক্ষতিটা হতো না। এটা শুধু ভিকটিমের একার ক্ষতি হয় নাই পরিবারগুলোর ক্ষতি হয়েছে। গভীর রাতে অপারেশন করে একটা আতঙ্কগ্রস্ত পরিবেশ তৈরি করেছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. খান।

অভিযোগ না থাকলে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটক করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সদস্যদের আরো বেশি সতর্ক হতে হবে বলেও উল্লেখ করেন এই মানবাধিকার কর্মী।