গঙ্গা চুক্তি নিয়ে ঢাকা-দিল্লির বৈঠক কীসের ইঙ্গিত?

ছবির উৎস, FBP INDIA
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার গঙ্গা চুক্তি বিষয়ক যৌথ কমিটির ৮৬তম বৈঠক সোমবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হতে যাচ্ছে। পাঁচ দিনের এই বৈঠকে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে ১১জন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল এদিনই কলকাতায় এসে পৌঁছচ্ছেন। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকটিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বস্তুত গত অগাস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কে এক ধরনের শীতলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক সময় যে সম্পর্ক খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল, তারও অবনতিও হয়েছে দৃশ্যতই।
ভারত মোটামুটি এটাও পরিষ্কার করে দিয়েছে যে বাংলাদেশে কোনও 'অনির্বাচিত' বা 'অন্তর্বর্তী' সরকারের সঙ্গে তারা পূর্ণ এনগেজমেন্টে যেতে আগ্রহী নয় – এবং মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সঙ্গে তারা এমন কোনও সমঝোতায় যাবে না, যেখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন আছে।
এই পটভূমিতেও যে গঙ্গা চুক্তি নিয়ে দু'দেশের যৌথ কমিটি মুখোমুখি বৈঠকে বসছে এবং সরেজমিনে ফারাক্কা ব্যারাজ পরিদর্শন করতে পারছে – এটাকে পর্যবেক্ষকদেরও অনেকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
বিবিসি জানতে পেরেছে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বৈঠকের ব্যাপারে 'রাজনৈতিক সবুজ সংকেত' (পলিটিক্যাল ক্লিয়ারেন্স) দেওয়ার পরেই এই বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া হয়, বাংলাদেশেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং যাবতীয় কর্মসূচি স্থির করা হয়।
এর প্রধান কারণ হল, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা চুক্তির তিরিশ বছরের মেয়াদ ২০২৬-র ডিসেম্বরেই শেষ হবে – ফলে কোন শর্তে চুক্তিটির নবায়ন করা হবে, সেটি স্থির করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ওই চুক্তির নবায়নের জন্য মাত্র বছর দেড়েকের মতো সময় হাতে আছে বলেই এই বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠকটিকে স্থগিত করতে চায়নি কোনও পক্ষই, দু'দেশের কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা যাচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি পদস্থ সূত্র বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "গঙ্গা চুক্তির বিষয়টি আলাদা, এখানে টেকনিক্যাল কমিটির বিশেষজ্ঞরা বৈঠকে বসছেন কারণ আমাদের হাতে চুক্তি রিনিউ করার জন্য হাতে খুব বেশি সময় নেই।"
তিনি আরও জানাচ্ছেন, আর একটি অভিন্ন নদী তিস্তার জল ভাগাভাগি নিয়ে ভারত কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনও আলোচনায় যাচ্ছে না – কারণ সেখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন আছে এবং ভারত মনে করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সেই আলোচনা চালানোর কোনও 'ম্যান্ডেট' নেই!
কী হবে বিশেষজ্ঞদের বৈঠকে?
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার যৌথ নদী কমিশনের অন্যতম সদস্য মুহাম্মদ আবুল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল গঙ্গা চুক্তি নিয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নিতে সোমবার সকালেই কলকাতায় এসে নামবেন।
গঙ্গা চুক্তিতেই বলা আছে, দু'দেশের বিশেষজ্ঞরা পর্যায়ক্রমিকভাবে ভারতে গঙ্গার ওপর ফারাক্কা ব্যারাজ পয়েন্টে ও বাংলাদেশে পদ্মার ওপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে জলের প্রবাহ ও অন্যান্য বিষয়ে যৌথ পরিদর্শন করতে পারবেন।
সেই অনুযায়ী, ৮৬তম বৈঠকের অংশ হিসেবে দুই দেশের প্রতিনিধিরাই আগামিকাল কলকাতা থেকে ট্রেনযোগে ফারাক্কা পয়েন্টের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাবেন।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তেসরা ও চৌঠা মার্চ ফারাক্কা ব্যারাজের বিভিন্ন অংশে যৌথ পরিদর্শন অনুষ্ঠিত হবে। ৫ মার্চ (বুধবার) যৌথ কমিটির সদস্যরা আবার কলকাতায় ফিরে আসবেন।
৬ই মার্চ কলকাতার একটি পাঁচতারা হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে গঙ্গা চুক্তি নিয়ে দু'দেশের 'টেকনিক্যাল কমিটি'র বিশেষজ্ঞদের বৈঠক। পরদিন (৮ই মার্চ) বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতের জলসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, এটি এমনিতে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের রুটিন বৈঠক হলেও যেহেতু গঙ্গা চুক্তির নবায়নের সময় এগিয়ে আসছে তাই এটির 'আলাদা গুরুত্ব' আছে।
গঙ্গায় ফারাক্কা পয়েন্টের আগে ও পরে শুষ্ক মৌসুমে জলের প্রবাহ কতটা বজায় আছে, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান কী বলছে, গঙ্গার জলপ্রবাহের কতটা পদ্মায় আর কতটা ভাগীরথী (হুগলী) নদীতে যাচ্ছে – এই বিষয়গুলো নিয়ে টেকনিক্যাল কমিটির বৈঠকে চুলচেরা আলোচনা হয়ে থাকে।
আগামী বছর গঙ্গা চুক্তি নবায়নের সময় বাংলাদেশ নতুন ফর্মুলায় জল ভাগাভাগির ওপর জোর দিতে চাইছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ফলে সে দিক থেকেও এই বৈঠকের আলাদা গুরুত্ব আছে।
আর এই বৈঠকের রাজনৈতিক গুরুত্ব হল, মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের আমলেও ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলকে এই সফরে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
তিস্তায় না, কিন্তু গঙ্গাতে হ্যাঁ
গত বছরের ৮ই অগাস্ট বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরেই ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআই-কে একটি সাক্ষাৎকার দেন।
সেই সাক্ষাৎকারে আরও নানা বিষয়ের সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, তার সরকার ভারতের কাছে অভিন্ন নদী তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যাও দাবি করবে।
ওই সাক্ষাৎকারের বক্তব্য স্পষ্টতই ভারতের মনঃপূত হয়নি এবং তারা সেটা ঢাকাকে বুঝিয়েও দিয়েছিল।
দিল্লিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কোনও সরকার নয় তাই তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক কোনও আলোচনাতে যাওয়ারও প্রশ্ন ওঠে না।
ফলে গত সাত মাসে তিস্তা চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কোনও অগ্রগতি হয়নি।
এমন কী, শেখ হাসিনার বিদায়ের মাত্র দিনকয়েক আগে যে 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা'য় ভারতের সক্রিয় যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছিল, সেটাও যথারীতি হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন :

ছবির উৎস, Getty Images
তিস্তার ক্ষেত্রে ভারত এক ধরনের অনমনীয় মনোভাব দেখালেও গঙ্গা চুক্তি নিয়ে কিন্তু দিল্লির দিক থেকে এক ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ওই চুক্তি নবায়নে তাগিদ যে ভারতের দিক থেকেও আছে, সেটা ঘটনাপ্রবাহ থেকেও স্পষ্ট।
ঢাকায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী অবশ্য এর মধ্যে অসুবিধার কিছু দেখেন না।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "গঙ্গা চুক্তি প্রায় তিন দশক ধরে 'টেস্টেড অ্যান্ড ট্রাস্টেড' – মানে ভরসা আর সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। এর মাঝে বাংলাদেশে এমন সরকারও এসেছে যারা ভারতের প্রতি ততটা বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু তাতে চুক্তির বাস্তবায়নে কোনও সমস্যা হয়নি।"
"ফলে এই চুক্তিটাকে যে দুই দেশই নবায়ন করতে চাইবে, এটাই তো স্বাভাবিক।"
"কিন্তু অন্য দিকে তিস্তার জল ভাগাভাগি নিয়ে আমরা কিন্তু এখনও কোনও চুক্তিই করে উঠতে পারিনি। ফলে গঙ্গা আর তিস্তার বিষয়টা সম্পূর্ণ আলাদা চোখে দেখতে হবে।"
"আর যেহেতু ঢাকায় বর্তমান সরকারের সঙ্গে দিল্লি কোনও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বা সমঝোতায় যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই তিস্তা নিয়ে আলোচনা না এগোলেও গঙ্গা নিয়ে বৈঠক কিন্তু ঠিকই হচ্ছে", বলছিলেন সাবেক হাই কমিশনার মি চক্রবর্তী।








