এশিয়া কাপে বাংলাদেশ নারী দল, চোখ অলিম্পিক ও বিশ্বকাপেও

ছবির উৎস, Bangladesh Football Federation
বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল নিশ্চিত করলো এশিয়া কাপ, ১৯৮০ সালের পরে এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো ফুটবল দল এশিয়ার সর্বোচ্চ এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাচ্ছে।
বাহরাইন ও মিয়ানমারকে হারিয়ে বাংলাদেশ এমন এক কীর্তি অর্জন করেছে যা আগে কোনো নারী দলের ছিল না, শেষ বার পুরুষ জাতীয় ফুটবল দল এশিয়া কাপ খেলেছিল ১৯৮০ সালে।
বছর দশেক ধরেই বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের এই গ্রুপটা একের পর এক বাধা পেড়িয়ে এই পর্যায়ে এসেছে, বয়সভিত্তিক নানা প্রতিযোগিতায় শিরোপার পরে, টানা দুইবার দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ফুটবল দলের শিরোপা জিতেছে এই দলটি।
তারই ধারাবাহিকতায় এবারে বাছাই পর্বে দুর্দান্ত খেলে এশিয়া কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।
বাংলাদেশের গ্রুপে ছিল স্বাগতিক মিয়ানমার, বাহরাইন ও তুর্কমেনিস্তান, প্রথম ম্যাচে বাহরাইনকে দিয়েছিল সাত গোল, এরপর মিয়ানমারকে ২-১ গোলে হারিয়ে কার্যত বাংলাদেশ এই গ্রুপের সেরা দল হওয়া নিশ্চিত করেছে।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে অস্ট্রেলিয়ায় হতে যাওয়া নারী এশিয়া কাপে খেলবে বাংলাদেশ।
স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া বাদে বাছাই পর্ব না খেলে এই টুর্নামেন্টে খেলা নিশ্চিত করেছে ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন ও রানার আপ দল যথাক্রমে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া, এবং তৃতীয় স্থানে থাকা জাপান।
ঋতূপর্ণার জাদু ও দলীয় ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল যখন এশিয়ার বড় মঞ্চে নিজেদের যোগ্যতা অর্জন করতে মরিয়া, তখন মিয়ানমারের বিপক্ষে এই ম্যাচ জয় শুধুমাত্র একটি ম্যাচ নয়, বরং আরও বড় ক্যানভাসে দলের এগিয়ে যাওয়ার শুরু।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফুটবল সাংবাদিক রিফাত মাসুদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই দলের প্রত্যেকে একেকজন যোদ্ধা, "বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থানে এরা বিদেশে গিয়ে প্রতিপক্ষের মাঠে গিয়ে যেভাবে জিতে এসেছে। ওদের ভেতরে জেতার একটা ক্ষুধা আছে।"
আরও কিছু বাস্তবতা তুলে ধরেছেন মি. মাসুদ, "এই দলের বেতন খুবই সামান্য, সাফ জয়ের পর যে অর্থ ঘোষণা করা হয়েছিল সেটা এখনো দেয়া হয় নাই।"
এই দলটা বয়সভিত্তিক নানা টুর্নামেন্ট জিতে এই পর্যায়ে এসেছে, একটা ধারাবাহিকতার ভিত্তিতেই এই সাফল্য বলছেন রিফাত মাসুদ।
র্যাঙ্কিংয়ে ৭৩ ধাপ এগিয়ে থাকা মিয়ানমারকে বাংলাদেশ এর আগে কখনোই হারাতে পারেনি, সেখানে ঋতূপর্ণার বাঁ পায়ের নিখুঁত ফিনিশিং থেকে মিয়ানমারকে হারিয়ে বাংলাদেশ এশিয়া কাপে খেলা নিশ্চিত করেছে।
একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য কিভাবে পুরো দলের আত্মবিশ্বাস, গতি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিতে পারে, ঋতুপর্ণাই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মাঠে তাঁর গতি, বল কন্ট্রোল, ও পজিশন বাছাই ছিল অসাধারণ, যা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে একের পর এক চাপ তৈরি করেছে।
২০২৪ সালে নেপালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপেও শিরোপা জেতানোতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন ঋতূপর্না চাকমা, তিনি সেই আসরের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার পেয়েছিলেন।
এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট বা গোল সংখ্যার হিসাব নয়, এটি বাংলাদেশের নারী ফুটবলের জন্য একটা নতুন মাইলফলক।
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক আফঈদা খাতুন বলেন, "অধিনায়ক হিসেবে আমার ছোট ক্যারিয়ারে এটাই সেরা ম্যাচ। বাংলাদেশের মানুষ সবসময় আমাদের সাপোর্ট করেছে বলেই আজ আমাদের এখান পর্যন্ত আসা।"
বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের অভিজ্ঞ ফুটবলার মারিয়া মান্ডা বলেন, "আগে জানতাম মিয়ানমার বড় দল আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করেছি তাই জিততে পেরেছি, এর আগে আমরা মিয়ানমারের সাথে কখনো জিততে পারিনাই, এটা আসলেই একটা বড় পাওয়া।"
সবচেয়ে বড় ব্যাপার নিয়মিত বড় দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার কারণে মিয়ানমার বা বাহরাইনের ফিফা র্যাংকিং বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো।
বাংলাদেশের কাছে হেরে যাওয়া মিয়ানমার এখন আছে ৫৫ নম্বরে, বাংলাদেশ আছে ১২৮-এ। কিন্তু মাঠের খেলায় এই ফারাক বোঝার উপায় নেই।

ছবির উৎস, Bangladesh Football Federation
কোচের দৃঢ়তা ও বাফুফের 'সাহসী সিদ্ধান্ত'
এইতো ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। বাংলাদেশ নারী ফুটবলে টালমাটাল এক পরিস্থিতি, সিনিয়র ফুটবলারদের একটা অংশ এমন এক অবস্থানে গিয়েছিলেন, 'হয় কোচ থাকবে, নতুবা আমরা'।
কোচ পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ২০২৪ সালের সাফ ফুটবল আসর থেকেই কোচের সাথে দৃশ্যত একটা দূরত্ব দেখা যাচ্ছিল, পরে 'কোচের আচরণের কারণে' সেই দূরত্ব একটা দ্বন্দ্বে রূপ নেয়, তারা এই কোচের অধীনে খেলা চালিয়ে নিতে অপারগ।
পিটার বাটলার ৫৮ বছর বয়সী একজন ফুটবল কোচ, যিনি ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাথে কাজ করছেন।
এর আগে তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের এলিট ফুটবল একাডেমির কোচ হিসেবে বাংলাদেশের ফুটবলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
ব্রিটেনে প্রিমিয়ার লিগ ফুটবল খেলা এই কোচ এর আগে লাইবেরিয়া ও বোতসোয়ানার জাতীয় ফুটবল দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নানা বিতর্কিত ঘটনার পরেও বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে পিটার বাটলারের অধীনেই দক্ষিণ এশিয়ান নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছিল।
ফুটবলাররা ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের অভিযোগ পত্রে লিখেছেন, মাঠ ও মাঠের বাইরে কোচ তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন, "আমাদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেন। দলের অভ্যন্তরে খেলোয়াড়দের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়রের কথা বলে বিভাজনের সৃষ্টি করেছেন। মেয়েদের পোশাক-আশাক নিয়ে কথা বলতে ছাড়েননি। বডি শেমিংও করেছেন। মেয়েদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলেন, বাজে মন্তব্য করেন কোচ।"
তবে বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্লেষক রানা শেখ তখন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সমস্যাটা ১৭-১৮ জন ফুটবলারকে নিয়ে নয়, মূলত ৩/৪ জন সিনিয়র ফুটবলারকে ঘিরেই এই বিদ্রোহ"।
তিনি বলেন, তাদেরই কাউকে বাটলার ওজন কমাতে বলেছেন, এটাকেই তারা 'বডি শেমিং' বলছেন।
সেই পরিস্থিতিতে কোচের ওপর আস্থা রেখেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, তাই বাংলাদেশের নারী ফুটবল বিশ্লেষক উদয় সিনা বিবিসি বাংলাকে বলেন বাংলাদেশের এশিয়া কাপ খেলার পেছনে, "সবচেয়ে বড় ক্রেডিট কোচ পিটার বাটলারের বাফুফেরও ক্রেডিট আছে।"
তিনি যোগ করেন, "গত সাফের সময় কোচের সাথে সিনিয়র ফুটবলারদের একটা মনমালিন্য ছিল, জানুয়ারি মাসে এতো সব বিরোধিতার পরেও এই কোচের সাথেই চুক্তি নবায়ন করেছে। সিনিয়র ফুটবলারদের বিরোধিতার মুখে এই সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ ছিল না, সেজন্য বাফুফের একটা ক্রেডিট।"
তার মতে, পিটার বাটলার ইংলিশ ফুটবল খেলে আসা লোক, উনি অনেক পেশাদার। কোচ ফিটনেসের সাথে কোনো আপস করেননি।
এটাকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের একটি সাহসী সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
যদিও কোচ পিটার বাটলার সংবাদ মাধ্যমে এসব ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেননি, তবে বাফুফে সূত্র থেকে জানা গেছে, সিনিয়র ফুটবলারদের ওজন বাড়ছিল, অনুশীলনে এসে টিকটক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যস্ত থাকতো, এসব ইস্যুতে কথা বলায় সিনিয়র ফুটবলাররা কোচের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল।
জানুয়ারি মাসে মাত্র ১৩ জন ফুটবলার নিয়ে ক্যাম্প শুরু করেছিলেন কোচ।
পরে সিনিয়রদের একটা বড় অংশ দলে ফিরেছেন খেলেছেনও।
অলিম্পিক ও বিশ্বকাপ কতো দূরে?
এশিয়া কাপ তো নিশ্চিত হলো, এবারে প্রশ্ন বাংলাদেশ কি বিশ্বকাপে খেলতে পারবে?
বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফুটবল সাংবাদিক রিফাত মাসুদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, এজন্য অনেক হিসাব- নিকাশ মেলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ১২টা দল খেলবে এশিয়া কাপে এখান থেকে সেরা ৮টা দল খেলবে কোয়ার্টার ফাইনালে, এখন ড্র কেমন হয় সেটার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। যদি ভারত বা নেপালের মতো কোনো দল উঠে যায়, এটা বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক হবে।
এশিয়া কাপের কোয়ার্টার ফাইনালের দলগুলো সরাসরি অলিম্পিকে খেলার সুযোগ পাবে, কোয়ার্টার ফাইনালের ৮ দলের মধ্যে চারটা জয়ী দল সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে। আরও দুইটা দল আন্তঃমহাদেশীয় প্লে অফ খেলে বিশ্বকাপে ওঠার সুযোগ পাবে।
অর্থাৎ মোট ছয়টা দল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে।
রিফাত মাসুদের মতে, "কাজটা অসম্ভব নয়, অন্তত একটা ম্যাচ জিতে গেলেই সম্ভব কোয়ার্টারে ওঠা। কিন্তু ড্র-তে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হতে পারে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপান এদের সাথে বড় ব্যবধানে হেরে গেলে পিছিয়ে যাবে।"
তিনি বলছেন, "সম্ভব কিন্তু বাস্তবতা বেশ কঠিন হবে বাংলাদেশের নারী দলটার জন্য। কারণ এই পর্যায়ের ফুটবল টুর্নামেন্টে এই প্রথম খেলবে বাংলাদেশ।"








