বিহারে মুসলমান ফেরিওয়ালাকে যেভাবে 'গণপিটুনি' দিয়ে হত্যা করা হলো

ছবির উৎস, Shahnawaz Ahmad
- Author, প্রীতি প্রভা
- Role, বিবিসি নিউজ হিন্দি, বিহার
"আমাকে স্বামীর নাম জিজ্ঞাসা করেছিল। যখনই আমি বললাম যে তার নাম মুহাম্মদ আতাহার হুসেইন, সঙ্গে সঙ্গেই আট-দশজন মারতে শুরু করল। আমার স্বামীকে মেরে ফেলল। আমি বিধবা হয়ে গেলাম, সন্তানরা অনাথ হয়ে গেল! এখন ওরা কাকে বাবা বলে ডাকবে?"
সেই রাতের ঘটনা সম্পর্কেএ কথাগুলো বলছিলেন মুহাম্মদ আতাহার হুসেইনের স্ত্রী শবনম পারভিন। এইটুকু বলেই কেঁদে ফেললেন তিনি।
পুলিশের কাছে যে এফআইআর দায়ের হয়েছে, তাতে ৪০ বছর বয়সি মুহাম্মদ আতাহার হুসেইনকে পাঁচই ডিসেম্বর রাতে বিহারের নাওয়াদা জেলায় রোহ অঞ্চলের ভট্টা গ্রামে নৃশংসভাবে মারা হয়েছিল।
আহত মি. হুসেইনকে বিহার শরীফ সদর হাসপাতালে নিয়ে এসে চিকিৎসা চলাকালীনই ১২ই ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় দুটো এফআইআর হয়েছে।
একটি করেছে তার পরিবার, অন্যটি দায়ের করেছে যাদের বিরুদ্ধে তাকে গণপিটুনির অভিযোগ আছে – তাদের তরফ থেকে। গণপিটুনির অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে, তারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
মি. হুসেইনের পরিবারের তরফে দায়ের করা অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে যে চুরির ভুয়া অভিযোগে বেশ কয়েকজন তাকে নৃশংস ভাবে মারধর করে। যাদের বিরুদ্ধে তাকে গণপিটুনি দেয়ার অভিযোগ, তারা পাল্টা অভিযোগ করছে যে আতাহার হুসেইন চুরির উদ্দেশে রাত্রে তাদের ঘরে ঢুকেছিলেন এবং চুরি করতে তাকে হাতেনাতে ধরা হয়েছিল।
আতাহার হুসেইনকে গণপিটুনি দেয়া এবং তার মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে।

ছবির উৎস, Shahnawaz Ahmad
কী বলছে পুলিশ?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আতাহার হুসেইন বিহারের নালন্দা জেলার বাসিন্দা ছিলেন। বিহার শরীফ এলাকার গগন দিওয়ান গ্রামে তার বাড়ি।
তার পরিবার বলছে যে তিনি গত প্রায় ২০ বছর ধরে রোহ এবং তার আশপাশের এলাকায় সাইকেলে চেপে কাপড় বিক্রি করে সংসার চালাতেন। তার শ্বশুরবাড়িও ওই অঞ্চলেরই মরুই গ্রামে।
নওয়াদা সদর ডেপুটি পুলিশ সুপার হুলাস কুমার বলছেন, "পাঁচই ডিসেম্বর রাতে পুলিশ খবর পায় যে একজন চোরকে চুরি করতে ধরে রেখেছে মানুষ। পরের দিন দুটো এফআইআর হয়। একটিতে আতাহার হুসেইনকে চুরির ঘটনায় মূল অভিযুক্ত করা হয়, আর অন্যটিতে তার স্ত্রী অভিযোগ করেন যে তাকে মারধর করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যে তাকে মারধর করা হয়েছে, এটা বলা হয় নি।"
মি. কুমার এটাও বলছেন যে তারা তদন্ত করে আতাহার হুসেইনের কোনও অপরাধমূলক কাজের রেকর্ড খুঁজে পান নি।
অন্যদিকে মি. হুসেইনের ভাই মুহাম্মদ চাঁদ বলছেন, "ছয়ই ডিসেম্বর আমরা যখন এফআইআর দায়ের করি তখনও তো আমার ভাই অজ্ঞান ছিল। আমাদের কাছে শুধু চুরির ভুয়া অভিযোগে মারধর করারই খবর ছিল। এরপরে যখন ভাইয়ের জ্ঞান ফিরে আসে তখন সে আমাদের বলে যে কীভাবে তার কাপড় খুলিয়ে ধর্মীয় পরিচয় জানা হয়েছে।"
মি. চাঁদ এটাও বলেছেন যে তারা দ্বিতীয় এফআইআর দায়ের করবেন।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post

ছবির উৎস, Shahnawaz Ahmad
মুসলমান পুরুষরা গ্রামের বাইরে যাচ্ছেন না
আতাহার হুসেইনের ভাই মুহাম্মদ চাঁদ বলছিলেন, "আমরা সবাই ভয়ে আছি। আমাদের গ্রামের কোনও মুসলমান পুরুষ ফেরি করতে বা পশু বা অন্যান্য ব্যাপারীরা গ্রামের বাইরে বেরচ্ছে না।"
তিনি বলছিলেন, মৃত্যুর আগে তার ভাই জানিয়েছিলেন যে পাঁচই ডিসেম্বর রাতে কাপড় ফেরি করে যখন ডুমরি গ্রাম থেকে নিজের বাড়ির দিকে ফিরছিলেন তখন তার সাইকেলের চাকা পাঙচার হয়ে যায়।
মি. চাঁদের অভিযোগ, "অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল তখন। ভট্টা গ্রামের পাশে একটা মোড়ে আগুন পোহাচ্ছিলেন কয়েকজন মানুষ – তাদের কাছেই ভাই জানতে চায় যে পাঙচার সারানোর দোকান কোথায় আছে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকা ওই ব্যক্তিরা ভাইয়ের নাম জিজ্ঞাসা করে। যেই নিজের নাম মুহাম্মদ আতাহার হুসেইন বলে ভাই, তখনই হামলা করে ওই ব্যক্তিরা।
"সেখানে আট-দশজন ছিল। জোর করে সাইকেল থেকে ভাইকে নামিয়ে তার সব টাকা-পয়সা লুঠ করে নেয় আর ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করার পরে হাত-পা বেঁধে টানতে টানতে তাকে একটা ঘরে নিয়ে যায় ওরা। সেখানেই বেধরক মারধর করে আধমড়া করে ফেলে দেয় ওরা।," বলছিলেন মুহাম্মদ চাঁদ।
তিনি এও জানান যে ওই লোকেরা ভেবেছিল যে তার ভাই মারা গেছে। তারপরেই পুলিশকে ফোন করে চুরির কাহিনিটা সাজায় ওরা।
পুলিশ এসে আতাহার হুসেইনকে নওয়াদা সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করায়।

ছবির উৎস, Shahnawaz Ahmad
স্ত্রী কীভাবে খবর পেলেন
আতাহার হুসেইনের স্ত্রী শবনম বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা এই ঘটনার ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। পরের দিন সকালে কেউ একজন মি. হুসেইনকে মারধর করার ছবি দেখায়। ওই ছবিটি এলাকার অনেকে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করছিলেন।
এভাবেই মি. হুসেইনের পরিবার ঘটনাটি জানতে পারে।
মিজ. শবনম বলছিলেন, "ছবিটি দেখে আমি তো প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম। চিৎকার করে কাঁদছিলাম আমি। দেওর শাকিব আর চাঁদ হাসপাতালে তাদের ভাইকে দেখতে গিয়েছিল। তখনও আমার স্বামী অজ্ঞান ছিলেন।
"ঘণ্টাখানেক পরে আমি যখন হাসপাতালে পৌঁছাই, দেখি তাকে ভীষণ মেরেছে। আমার গলার আওয়াজ পেয়েই ওর জ্ঞান ফেরে – ধীরে ধীরে চোখ খোলেন তিনি। জানিয়েছিলেন, 'ভীষণ ব্যথা। ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করো। আমার চিকিৎসা করাও'। ওখানে যে পুলিশ ছিল তাদের আমি অনেক বলেছিলাম, তবুও ওরা আমার স্বামীকে নিয়ে যেতে দেয় নি, বলেছিল ওখানেই চিকিৎসা হবে, কোথাও যেতে দেওয়া হবে না," বলছিলেন মিজ. শবনম।
তিন দিন পরে মি. হুসেইনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তার।
পরিবার অনুরোধ করেছিল কোনও বেসরকারি হাসপাতালে তাকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হোক। পরে পাওয়াপুরী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয় মি. হুসেইনকে।
অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না দেখে একদিন পরে পরিবারের সদস্যরা আহত আতাহার হুসেইনকে নিয়ে বিহার শরীফের দিকে রওনা হন।
পথেই মৃত্যু হয় মি. হুসেইনের। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার দেহের ময়না তদন্তের রিপোর্ট আসে নি।

ছবির উৎস, Shahnawaz Ahmad
চুরির অভিযোগ
আতাহার হুসেইনের স্ত্রী দশ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১৫ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ ১১ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। ধৃতরা সকলেই ভট্টা গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ বলছে বাকি অভিযুক্তদেরও দ্রুত গ্রেফতার করা হবে।
মিজ. শবনমের দায়ের করা অভিযোগের পাল্টা আরেকটি মামলাও দায়ের হয়েছে। যে গ্রামে মি. হুসেইনকে মারধর করা হয়েছিল, সেই ভট্টা গ্রামের বাসিন্দা সিকান্দার যাদব আতাহার হুসেইনের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ দায়ের করেছেন।
পুলিশ অবশ্য মি. হুসেইনকে মারধর করার ঘটনায় সিকান্দার যাদবকেও গ্রেফতার করেছে। এর বাড়িরই একটি ঘরে মি. হুসেইনকে মারধর করা হয়েছিল।
মি. যাদবের স্ত্রী মিজ. বিন্দি অভিযোগ করছিলেন যে আতাহার হুসেইন তাদের ঘরে চুরি করার সময়ে তার চেঁচামেচিতেই লোক জড়ো হয়ে যায় এবং তাকে ধরে ফেলে মারধর করে।
ঘটনার দিন পনেরো কেটে গেলেও মিজ. বিন্দির ঘরে জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
যে ঘরটাতে মি. হুসেইনকে মারধর করা হয়েছিল, সেই ঘরটি রাস্তার পাশেই। দেখা গেল কাঁচি, প্লাস, লোহার রড ইত্যাদি পড়ে আছে সেখানে।
আমাদের চোখ সেদিকে যেতেই সরিয়ে ফেলা হল সেগুলো।
মিজ. বিন্দি দাবি করছিলেন, "দুই-তিন লাখ টাকার গয়না চুরি হয়ে গেছে। চোর ধরা পড়ার পরে বাসনপত্র তো পাওয়া গেছে কিন্তু গয়না পাওয়া যায় নি। একজন চোর ধরা পড়েছিল, বাকি চোরেরা হয়ত পালিয়ে গেছে।"
সিকান্দার যাদব আর তার স্ত্রী দিন মজুরের কাজ করেন। বাড়িতে টয়লেটও নেই – মাঠে যেতে হয় বাড়ির নারীদের। এরকম একটি পরিবারের ঘরে দুই-তিন লাখ টাকার গয়না কি আদৌ রাখা থাকতে পারে?
এই গ্রামে হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই বসবাস।
এক বাসিন্দা মুহাম্মদ আসগার বলছিলেন, "আতাহার প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে সাইকেলে চেপে কাপড় ফেরি করেন। নারী ও শিশুদের জামা কাপড় বিক্রি করতেন তিনি। ওর শ্বশুরবাড়িও রোহ এলাকায়, নিয়মিতই আসতেন। গ্রামের নারীরা তো সবাই চিনত আতাহারকে।"








