স্তন্যদান নিয়ে ৭টি ভুল ধারণা এবং যেসব বিষয় আপনার জানা উচিৎ

ব্রাজিলের রিও ডে জানেইরোর একটি হাসপাতালে বিশ্ব স্তন্যদান সপ্তাহের প্রচারাভিযানে অংশ নেয়া এক নারী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ব্রাজিলের রিও ডে জানেইরোর একটি হাসপাতালে বিশ্ব স্তন্যদান সপ্তাহের প্রচারাভিযানে অংশ নেয়া এক নারী
    • Author, এফরেম জেব্রিব
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস

কর্মস্থলে যেন নারীরা তাদের শিশুসন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন, সেজন্য আরও বেশি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বুকের দুধ খাওয়ানোর হার যেন বাড়ানো যায়, সেজন্যে বার্ষিক প্রচারাভিযানের সময় জাতিসংঘ এই আহ্বান জানায়।

জাতিসংঘ বলছে, যেসব শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হয় না, এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাদের মৃত্যুর আশংকা যারা কেবল বুকের দুধ খায় তাদের তুলনায় ১৪ গুন বেশি। জাতিসংঘ বেতন-সহ মাতৃ-কালীন ছুটি চালু, বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য কাজের মাঝে বিরতি, এবং কর্মস্থলে বুকের দুধ খাওয়াতে মায়েদের জন্য পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছে।

স্তন্যদান নিয়ে এখনো অনেক মিথ বা ভুল ধারণা চালু আছে, যা শুনে মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ দেয়া থেকে বিরত থাকতে পারে। বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে বহুল প্রচলিত কিছু ধারণা যে আসলে একদম ভুল, দুজন বিশেষজ্ঞ তা ব্যাখ্যা করেছেন আমাদের কাছে। এদের একজন ক্যাটরিওনা ওয়েইট, যিনি ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুলের ক্লিনিকাল ফার্মাকোলজি এন্ড গ্লোবাল হেলথের অধ্যাপক এবং উগান্ডার কাম্পালায় মেকরিয়ার ইউনিভার্সিটি কলেজ অব হেলথ সায়েন্সের ফেলো। অপরজন অ্যালেস্টেয়ার সাটক্লিফ, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জেনারেল পিডিয়াট্রিক্সের অধ্যাপক।

মিথ ১: বুকের দুধ খাওয়ালে সাধারণত স্তনে ব্যথা এবং স্তনবৃন্তে ঘা হয়

প্রফেসর ওয়েইট: এর উত্তর দেয়া একটু কঠিন। বুকের দুধ খাওয়ানোর শুরুর দিকে কিছু অস্বস্তি হওয়া একেবারেই স্বাভাবিক, এবং এতে অভ্যস্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত শুরুতে স্তনবৃন্তে কালশিটে পড়া কিংবা যন্ত্রণা হওয়া একদম স্বাভাবিক। কিন্তু বুকের দুধ খাওয়ানোর কারণে আসলে স্তনে ব্যথা বা যন্ত্রণা হয় না। যদি কারও এমন হয় তাহলে মনে করতে হবে স্তনবৃন্তে হয়তো কোন ইনফেকশন বা সংক্রমণ হয়েছে, অথবা এটি ঠিকভাবে শিশুর মুখে দেয়া হচ্ছে না। শুরুতে কিছুটা অস্বস্তি হলে সেটা একেবারেই স্বাভাবিক, এবং নতুন মায়েদের এই বিষয়টার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়তো কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে কারও যদি বেশ ব্যথা বা যন্ত্রণা হয়, সেটি নিয়ে ডাক্তার, নার্স বা ধাত্রীর সঙ্গে কথা বলা উচিৎ।

 বুকের দুধ খাওয়ানের কারণে কারও স্তনে তীব্র ব্যথা হওয়া উচিৎ নয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বুকের দুধ খাওয়ানের কারণে কারও স্তনে তীব্র ব্যথা হওয়া উচিৎ নয়

মিথ ২: একেবারে শুরুতেই স্তন্যদান শুরু না করলে পরে আর করা যায় না

প্রফেসর সাটক্লিফ: স্তন্যদানে মায়েদের উৎসাহিত করে এমন যে কোন কিছুই আসলে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নানা দিক দিয়ে উপকারী। মানুষের আচরণের ওপর কঠোর সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কৃত্রিম বিধিনিষেধ আরোপ করার এই ব্যাপারটার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে এটা ঠিক যে জন্মের পরপরই শিশুকে যদি মা স্তন্যদান শুরু করেন তার অনেক উপকারিতা আছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পুষ্টি। স্তন্যদান শুরু করার আরেকটা উপকারিতা হচ্ছে এটি ইউটেরাস বা জরায়ুর সংকোচন প্রক্রিয়া শুরু করতে সাহায্য করে। আর এর ফলে সন্তান প্রসব পরবর্তীকালে জরায়ুতে যে রক্তক্ষরণ হয়, সেটি থামানো বা প্রতিরোধে সাহায্য করে। এছাড়া সন্তান প্রসবের পর প্রথম কয়েকদিন মায়ের শরীরে কোলোস্ট্রাম নামে প্রোটিন সমৃদ্ধ একটি পদার্থ তৈরি হয়। এটি খুবই সমৃদ্ধ একটি উপাদান যা স্তন্যদান প্রক্রিয়া শুরুতে অবদান রাখে।

 শিশুর জন্মের পরপরই তাকে বুকের দুধ দেয়ার উপকারিতা অনেক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শিশুর জন্মের পরপরই তাকে বুকের দুধ দেয়ার উপকারিতা অনেক

মিথ ৩: বুকের দুধ খাওয়ালে কোন ঔষধ খাওয়া যায় না

প্রফেসর ওয়েইট: বিশ্বের যে কোন জায়গাতেই মায়েরা সাধারণত এই প্রশ্নটাই প্রথম করেন। তারা জানতে চান, ‘যে কোন ঔষধ কি আমার শিশুর জন্য নিরাপদ?’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক ঔষধই আসলে খুবই কম মাত্রায় শিশুর কাছে পৌঁছায়। কোন ডাক্তার যদি বলে আপনাকে ঔষধ খেতে হবে, তখন তাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করুন। কিন্তু এমন সম্ভাবনাই বেশি যে এই ঔষধ নিরাপদে আপনি গ্রহণ করতে পারেন। একজন শিশুর আসলে সবচেয়ে বেশি দরকার একজন সুস্থ-সবল মা। সংক্রমণ, ডিপ্রেশন বা সাধারণ ব্যথা-বেদনার জন্য সাধারণত যেসব ঔষধ খেতে হয়, সেগুলো খুব সম্ভবত নিরাপদ।

স্তন্যদান করলে যেসব ঔষধ গ্রহণ করা যাবে না, সেগুলোর সংখ্যা আসলে খুবই কম। সাধারণত ক্যান্সার বা এরকম কোন গুরুতর নির্দিষ্ট রোগের ঔষধ এগুলো। এছাড়া অন্য কিছু ঔষধ আছে যেগুলো ব্যবহারের আগে এর ঝুঁকি এবং উপকারিতা ভালোভাবে বিবেচনা করে দেখতে হয়। স্তন্য-দানকারী কোন মাকে যখন কোন ঔষধ খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়, তখন তিনি যেন এই ঔষধের ব্যাপারে প্রশ্ন করতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। দোকানে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কেনা যায় এমন কিছু ঔষধের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, যেমন ঠাণ্ডা বা ফ্লুর ঔষধ- কারণ এর মধ্যে এমন উপাদান থাকে যা বুকের দুধ কমিয়ে দিতে পারে। আর হার্বাল বা ভেষজ ঔষধের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিৎ, কারণ আপনি আসলে জানেন না এর মধ্যে কী আছে। এসব ঔষধ কিন্তু ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।

স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য বেশিরভাগ ঔষধই নিরাপদ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য বেশিরভাগ ঔষধই নিরাপদ

মিথ ৪: কেবল সাধারণ খাবার খাওয়া উচিৎ এবং বুকের দুধ দেয়ার আগে মশলাযুক্ত খাবার পরিহার করা উচিৎ

প্রফেসর ওয়েইট: স্তন্যদানের সময় খাওয়া যাবে না এরকম কোন খাবার আসলে নেই। তবে আপনার বুকের দুধে ঠিক কী পুষ্টি উপাদান থাকবে, তা নির্ভর করে আপনি কী ধরণের খাবার খাচ্ছেন তার ওপর।

তবে কিছু কিছু খাবারের বেলায় মা হয়তো একটি প্যাটার্ন দেখতে পাবেন। যেমন আমার একটি সন্তানের বেলায় আমি খেয়াল করেছিলাম, যতবারই আমি কমলার মতো কোন টক ফলের জুস খাচ্ছি, আমার বাচ্চার মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠছে। আপনি কি খাবার খেলে আপনার সন্তান কিরকম আচরণ করছে সেরকম একটি প্যাটার্ন আপনি অনেক সময় খেয়াল করতে পারেন। কিন্তু আসলে এরকম কোন খাবার নেই যেটা আপনার সন্তানের জন্য ক্ষতিকর, বা যেটা আপনার পরিহার করা উচিৎ।

প্রফেসর ওয়েইট বলছেন, স্তন্যদানকারী মা সব খাবারই খেতে পারবেন, কোন বিধিনিষেধ নেই

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রফেসর ওয়েইট বলছেন, স্তন্যদানকারী মা সব খাবারই খেতে পারবেন, কোন বিধিনিষেধ নেই

মিথ ৫: আপনি বুকের দুধ খাওয়াতে চাইলে কখনোই ফর্মুলা দুধ খাওয়াতে পারবেন না

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

প্রফেসর ওয়েইট: এটা পুরোপুরি ঠিক নয়। তবে মায়ের স্তনে কী পরিমাণ দুধ তৈরি হবে সেটা নিয়ন্ত্রিত হয় চাহিদা এবং সরবরাহের ভিত্তিতে। নারীর দেহের গঠন আসলে এত চমৎকারভাবে তৈরি যে শিশুর জন্য এটি যথেষ্ট দুধ তৈরি করতে পারে। শিশু যখন স্তনবৃন্ত চুষতে থাকে, সেটি নারীর শরীরের হরমোনকে যতটুকু দুধ দরকার, ততটুকু দুধ তৈরি করতে সংকেত দেয়। কাজেই একজন মা, তিনি একেবারেই একটি ছোট শিশু, বড় শিশু নাকি যমজ সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছেন – তার শরীরে সেই অনুপাতে যথেষ্ট দুধ তৈরি হবে।

আর শিশুকে ফর্মুলা দুধ দেয়া শুরু করলে, নারীদেহে এই সংকেত এবং দুধ উৎপাদন চক্রে একটা ব্যাঘাত ঘটে। তখন নারীর শরীর যথেষ্ট সংকেত পায় না যে তার শিশুর আরও দুধ দরকার। কোন মায়ের বুকে যখন যথেষ্ট দুধ আসে না, এবং তিনি শিশুকে ফর্মুলা দুধ দিতে শুরু করেন, তাতে হয়তো একটা সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যাবে, কিন্তু এর ফলে সমস্যাটা কিন্তু আরও গুরুতর রূপ নেবে।

আবার কোন নারীর যখন রাতে ঘুম হচ্ছে না, বা অসুস্থ, কিংবা ভীষণ ক্লান্ত, তখন তার সঙ্গী হয়তো শিশুকে কিছু ফর্মুলা দুধ দিচ্ছেন, যাতে করে শিশুর মা কিছুটা বিশ্রাম পান। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এই নারী আবার স্তন্যদান শুরু করতে পারবেন না। কাজেই ফর্মুলা দুধ দিলে স্তন্যদান বন্ধ হয়ে যাবে এটা পুরোপুরি ঠিক নয়। তবে ফর্মুলা দুধ দিলে তা স্তন্যদানের ক্ষেত্রে খুব সহায়ক হয় না।

শিশুকে ফর্মূলা দুধ খাওয়ালে অনেক সময় মায়ের বুকে দুধের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শিশুকে ফর্মূলা দুধ খাওয়ালে অনেক সময় মায়ের বুকে দুধের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে

মিথ ৬: অসুস্থ অবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ানো ঠিক নয়

প্রফেসর সাটক্লিফ: না, এটাও একটা মিথ। কেবল যদি কোন নারীর এইচআইভি বা হেপাটাইটিস হয়, তখনই কেবল শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো নিষেধ। কারণ বুকের দুধের মাধ্যমে এসব ভাইরাস শিশুর দেহে সংক্রমিত হতে পারে। এরকম ঘটনা আগে ঘটতে দেখা গেছে। মা যদি অসুস্থও থাকেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি সন্তানকে বুকের দুধ দিয়ে যেতে পারেন, কারণ মায়ের শরীরে এমন এন্টিবডি তৈরি হয়, যা সন্তানকেও সুরক্ষা দেয়। এরকম ঘটনা খুবই বিরল যে কোন মায়ের রোগ স্তন্যদানের মাধ্যমে তার শিশুর দেহে সংক্রমিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মা অসুস্থ হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুকে বুকের দুধ দেয়া অব্যাহত রাখতে পারেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশেষজ্ঞরা বলেন, মা অসুস্থ হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুকে বুকের দুধ দেয়া অব্যাহত রাখতে পারেন

মিথ ৭: এক বছরের বেশি ধরে স্তন্যদান করলে শিশুকে দুধ ছাড়ানো কঠিন

প্রফেসর ওয়েইট: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ হচ্ছে সন্তানকে ছয় মাস পর্যন্ত কেবল বুকের দুধই খাওয়ানো উচিৎ। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার দিলেও যতদিন ইচ্ছে বুকের দুধ দেয়া চালিয়ে যাওয়া উচিৎ। বুকের দুধ কখন বন্ধ করতে হবে তার কোন বাঁধা-ধরা সময় নেই। যুক্তরাজ্যের মতো উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে বেশিরভাগ শিশুকেই এক হতে দুই বছর বয়সের মধ্যে বুকের দুধ দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে, যেমন উগান্ডায় দুই হতে তিন বছর বয়স পর্যন্ত কিন্তু শিশুকে বুকের দুধ দেয়া হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যতটা সময় ধরে শিশুকে কেবল বুকের দুধ দেয়ার সুপারিশ করে, তত দীর্ঘ মাতৃ-কালীন ছুটি মায়েরা সাধারণত পান না, এটা সারা দুনিয়া জুড়েই একটা সমস্যা।