সুদানে সেনাবাহিনী এবং মিলিশিয়ার লড়াই অব্যাহত, শতাধিক মানুষ নিহত

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, জেইনাব মোহাম্মদ সালিহ এবং ইমানুয়েল ইগুনজা,
- Role, বিবিসি নিউজ, খার্তুম এবং নাইরোবি
সুদানের সেনাবাহিনী এবং একটি কুখ্যাত আধা-সামরিক বাহিনীর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই দেশটিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং এ পর্যন্ত দুপক্ষের লড়াইয়ে ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত আর এক হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। রাজধানী খার্তুমে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং সেনা সদর দফতরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনীর মধ্যে লড়াই চলছে।
চিকিৎসকদের একটি সংগঠন জানিয়েছে, কেবল খার্তুমেই ২৫ জন মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৭ জন বেসামরিক মানুষ। সুদানে বেসামরিক শাসন ফিরিয়ে আনার এক প্রস্তাবিত পরিকল্পনা নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে এই সংঘাত শুরু হলো।
সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) উভয়েই দাবি করছে, বিমান বন্দর এবং রাজধানী খার্তুমের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তাদের দখলে। সারারাত ধরে এসব জায়গায় লড়াই চলেছে।
খার্তুমের সংলগ্ন শহর ওমডারমান এবং কাছাকাছি আরেক শহর বাহরিতেও রোববার ভোরের প্রথম প্রহরে ভারী গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, লোহিত সাগরের বন্দর নগরী পোর্ট সুদানেও গোলাগুলি চলছে।

ছবির উৎস, Getty Images
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধবিমানগুলো আরএসএফের ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ চালাচ্ছে। বিমানবাহিনী যখন শনিবার আকাশ থেকে আধা-সামরিক আরএসএফের তৎপরতার ওপর নজর রাখছিল, তখন তারা লোকজনকে তাদের ঘরে থাকতে বলেছিল।
খার্তুমের বাসিন্দারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা ভয়ে-আতংকে আছেন। একজন জানিয়েছেন, তার পাশের বাড়ির ওপর গুলি চলছে।
সুদানের ডাক্তারদের একটি কমিটি জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এবং শহরে অন্তত ৫৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। এক ডজনের মতো সেনা সদস্য নিহত হয়েছে। এদের কাউকে কাউকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল।
এই সংগঠনটি বলছে, সব মিলিয়ে মোট ১১০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
জাতিসংঘের একটি সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর (ডাব্লিউএফপি) তিনজন কর্মী সুদানের পশ্চিমের কাবকাবিয়ার একটি সামরিক ঘাঁটির কাছে আরএসএফ এবং সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির সময় নিহত হয়েছে।
সুদানে ২০২১ সালের অক্টোবরে এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর হতে দেশটি মূলত জেনারেলরাই চালাচ্ছে।
সুদানের ক্ষমতার কেন্দ্রে এখন জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান, তিনিই কার্যত এখন দেশটির নেতা। তার প্রতি অনুগত সামরিক ইউনিটগুলোর সঙ্গে লড়াই চলছে আরএসএফের, যেটির নেতৃত্বে আছেন সুদানের উপ-নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগালো, যিনি হেমেডটি নামেও পরিচিত।
হেমেডটি বলেছেন, তার সৈন্যরা সব সেনা ঘাঁটি দখল না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
এর পাল্টা সুদানের সশস্ত্র বাহিনীগুলোও আধা-সামরিক বাহিনী আরএসএফ-কে ধ্বংস না করা পর্যন্ত কোন ধরণের আপোস-আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে।
চারিদিকে আতংক

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
খার্তুমের আকাশে এখন কুন্ডলি পাকিয়ে উঠছে কালো ধোঁয়া, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে লোকজন দৌড়াদৌড়ি করছে গোলাগুলি থেকে নিজেদের আড়াল করার জন্য।
রয়টার্সের একজন সাংবাদিক জানান, রাস্তায় অনেক সাঁজোয়া যান চলাচল করছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, খার্তুম বিমান বন্দরে একটি বেসামরিক বিমান আগুনে পুড়ছে। সৌদি এয়ারলাইন সৌদিয়া বলেছে, তাদের একটি এয়ারবাস গোলাগুলির মুখে পড়েছে।
অনেক এয়ারলাইন্স খার্তুমে তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। প্রতিবেশি দেশ চাড বলেছে, তারা সুদানের সঙ্গে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে।
“আমাদের এখানে কোন বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই”, বিবিসিকে জানিয়েছেন খার্তুম সফররত এক ব্রিটিশ-সুদানি ডাক্তার। “এখানে খুব গরম। কিন্তু আমরা জানালা পর্যন্ত খুলতে পারছিনা, বাইরে কানে তালা লেগে যাওয়ার মতো এক বিকট আওয়াজ।”
আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী, যিনি কেনিয়ায় অবস্থানরত তার বোনের মাধ্যমে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন, তিনি জানান, “গোলাগুলি এখনো চলছে এবং লোকজন ঘরের মধ্যে আটকে আছে- সেখানে এতটাই ভয় আর আতংক।”
একটি সামরিক বিমান যখন মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে তখন দুয়া তারিক বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, “আমার পাশের বাড়ির ছাদের ওপর এই বিমান থেকে গুলি করা হচ্ছে এবং আমরা এখন বাঁচার জন্য আশ্রয় খুঁজছি।”
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন এবং রাশিয়া- সবাই অবিলম্বে এই লড়াই বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব এরই মধ্যে জেনারেল বুরহান এবং জেনারেল দাগালোর সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদেরকে সহিংসতা থামাতে বলেছেন।
কী থেকে এই সহিংসতার সূত্রপাত

ছবির উৎস, AFP
বিবিসির এমানুয়েল ইগুঞ্জা জানাচ্ছেন, দেশটিতে প্রস্তাবিত বেসামরিক সরকারে কে একীভূত সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করবেন - তা নিয়ে বিবাদ তৈরি হয়েছে।
সুদানে একটি বেসামরিক সরকার পুনপ্রতিষ্ঠা করার জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে মতৈক্যে পৌঁছানোর এক চেষ্টা ব্যর্থ হয় - যার পেছনে আরএসএফের ১০০,০০০ সদস্যকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার প্রশ্নটিও ছিল সমস্যার কারণ।
সামরিক বাহিনীর এ দুই অংশের মধ্যে সংঘাতের এক পর্যায়ে বৃহস্পতিবার আরএসএফ উত্তরের মেরওয়ে শহরের একটি সামরিক ঘাঁটির কাছে তাদের সেনাদের মোতায়েন করে।
সুদানের নেতা জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান বলেছেন তিনি তার ডেপুটি এবং আরএসএফের অধিনায়ক মোহামেদ হামদান দাগালোর সাথে আলোচনা করতে ইচ্ছুক।
জেনারেল বুরহান ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সুদানের বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতাসীন হবার পর থেকেই দেশটিতে রাজনৈতিক তোলপাড় চলছে।
বিবিসির একজন সংবাদদাতা জানান, ঠিক কি নিয়ে শনিবারের সহিংসতার সূত্রপাত তা এখনও স্পষ্ট নয় – তবে এ দুটি বাহিনীর মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা চলছিল।
সুদানের রাজনৈতিক দলগুলো এর আগে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের সাথে ক্ষমতা-ভাগাভাগির এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল।
তারা উভয় পক্ষকেই সহিংসতা অবসানের আহ্বান জানিয়েছে বলে রয়টার্স খবর দিয়েছে।
পশ্চিমা এবং আঞ্চলিক নেতারা দু পক্ষকে উত্তেজনা হ্রাস করা এবং দেশটিতে বেসামরিক শাসন ফিরিয়ে আনার জন্য আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক দলগুলো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে রক্তপাত বন্ধে সহায়তা করারও আহ্বান জানিয়েছে।








