ইশারা ভাষায় কাজের সুযোগ কতটা?

ঢাকার আসাদগেট বধির স্কুলে পড়তেন শাহ্ বাবুল আহমেদ, আর নাজমা বেগম পড়তেন ময়মনসিংহ বধির স্কুলে। খেলাধুলার প্রতি দুজনেরই ছিল বেশ আগ্রহ। এক ক্রীড়া অনুষ্ঠানেই পরিচয় হয় দুজনের। স্কুলের শিক্ষকরা তাঁদের বিয়ে করানোর ব্যবস্থা করেন। এখন তাঁদের দুই সন্তান বড় হয়েছে। তাঁরা নিজেরা শুনতে বা বলতে না পারলেও তাঁদের সন্তানেরা পারেন। যদিও সন্তানদের সাথে তাঁদের কথোপকথনের মূল উপায় ইশারা ভাষা।
সেই ইশারা ভাষাকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন তাঁদের সন্তান বদরুন নাহার তমা। মিজ তমা নিজের দুই সন্তান লালন পালনের পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন ইশারা ভাষার কাজ। ইশারা ভাষা মাতৃভাষা হলেও কাজের জন্য ট্রেনিং নিতে হয়েছে মিজ তমাকে।
চৌদ্দ বছরের মতো একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দেশ টিভিতে ইন্টারপ্রেটার বা দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন। এখন সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কাজের জায়গা থাকলেও নির্দিষ্ট বেতনের চাকরির সুযোগটা এখন সেরকম নেই। তার ভাইও ইশারা ভাষায় পারদর্শী, কিন্তু পেশা হিসেবে ধরে রাখতে পারেননি, কারণ নির্দিষ্ট বেতনভুক্ত আয়ের নিশ্চয়তা কম এইক্ষেত্রে।
২৩শে সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস দিবস। বাংলাদেশে লক্ষাধিক শ্রবণ প্রতিবন্ধী এবং বাক প্রতিবন্ধী থাকলেও ইশারা ভাষার দোভাষী সংখ্যা খুবই সীমিত। ইশারা ভাষা শেখা ও পেশা হিসেবে নেয়ার সুযোগ আদৌ কতটা আছে বাংলাদেশে?

কাজের পরিধি ও পরিস্থিতি
ইশারা ভাষাকে সরাসরি একমাত্র পেশা হিসেবে নেয়ার সুযোগ কম হলেও ইশারা ভাষা জানা থাকাটা একটা বাড়তি ভাষা জানার মতোই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন দোভাষী ও ইশারা ভাষার প্রশিক্ষক আরিফুল ইসলাম। তিনি বিটিভিতে ইশারা ভাষায় সংবাদ পরিবেশনের কাজও করেন। তার ইশারা ভাষা শেখার শুরুটাও হয়েছিলো ঘর থেকে। তার বড় দুই ভাই শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে খুব ছোটবেলা থেকেই ভাষাটা শিখেছেন মিঃ ইসলাম।
মিঃ ইসলাম বলছিলেন ইদানিং অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা ছাড়াও কর্মস্থলে প্রতিবন্ধী-বান্ধব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে চান যেন তেমন চাহিদা-সম্পন্ন ব্যক্তিরা সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সেক্ষেত্রে কারও বায়োডাটাতে যদি ইশারা ভাষার বিষয়টি যুক্ত থাকে তাহলে চাকরির জন্য অনেক ক্ষেত্রেই তারা এগিয়ে থাকবেন কারণ তেমন প্রতিষ্ঠান এমন বাড়তি দক্ষতাসম্পন্ন মানুষকে নিতে চাইবে যেন তেমন প্রয়োজনে তিনি কাজে আসেন। “সিভির পাশাপাশি উনি যে চাকরিতে যাবে বা যে প্ল্যাটফর্মে কাজ করবে, সেখানে একজন ইন্টারপ্রেটার হিসেবে উনি একটা নেতৃত্ব দিবেন” যেটা চাকরিতে তার গুরুত্ব বাড়াতে পারে বলছিলেন মিঃ ইসলাম। যেমন ইশারা ভাষা জানা থাকায় সেরকম অনেক বেসরকারি চাকরির অফার পেয়েছেন মিঃ ইসলাম।

প্রতিবন্ধীদের ঘিরে আলোচনা, তাঁদের মূলধারার সাথে যুক্ত করার প্রবণতা বা এনিয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে, তবুও ইশারা ভাষাকে এখনো পেশা হিসেবে নেয়ার দিকটা বেশ অপ্রচলিতই বলা যায়।
“যখন ডাক পড়ছে তখন কাজটা করে দিয়ে আসা হচ্ছে,” বলছিলেন মিজ তমা। তিনিও অবশ্য মনে করেন বিভিন্ন এনজিও বা প্রতিবন্ধী-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে চায় এবং সেক্ষেত্রে যারা ভাষাটা জানেন তাদের যে কদর বেড়েছে। আগের দেশ টিভির চাকরি না থাকলেও তার নিজের কাজের পরিধি বেড়েছে বলে জানাচ্ছেন তিনি। “আমি শুরুতে যখন এই লাইনে আসি তখন আমি শুধু বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতাম, আর টেলিভিশন, এই দুটা পথই ছিল। এখন এনিয়ে বিভিন্ন ভিডিও সিডি হচ্ছে, অনুষ্ঠান, টক শো, এমন বিভিন্ন ধরণের কাজের সুযোগ বেড়েছে” বলছিলেন তমা।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এছাড়া বিভিন্ন বড় অনুষ্ঠানেও কদর তৈরি হয়েছে ইশারা ভাষার দোভাষীদের। যেমন কোনও অনুষ্ঠান, ভাষণ বা সম্মেলনে শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বোঝার জন্য অনেক সময়ই একজন ইশারা ভাষার দোভাষী রাখা হয়।
যদিও যাদের জন্য ইশারা ভাষা, অর্থাৎ শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধীরা, তারা এখনও অনেকটাই বঞ্চিত বলে মত মিজ তমা। তার অভিজ্ঞতায় তেমন অনুষ্ঠানগুলোতে যেমন শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের খুব একটা দেখা যায় না। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বা টেলিভিশনে প্রচার করা হয় এমন দিকগুলোতে ইশারা ভাষার দোভাষীর উপর সার্বক্ষণিক ক্যামেরা না থাকায় সেটা কাজেও আসে না।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসেবে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি শ্রবণ প্রতিবন্ধী ও ১ লাখ ৯৩ হাজারের বেশি বাক প্রতিবন্ধী রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা চিকিৎসা, আইনি সেবা বা দৈনন্দিন চলাফেরার জন্য একজন দোভাষী ছাড়া তাঁরা চলতে পারেন না। এমন পরিবারের যারা ইশারা ভাষা পারেন তারা পরিবারের সাথে সার্বক্ষণিক থাকেন না। অনেকের একজন দোভাষীর জন্য খরচ করার মতো আর্থিক সামর্থ্যের সমস্যাও থাকে। যারা পারেন তাঁরাও অনেক ক্ষেত্রেই বিনামূল্যে বা নামমাত্র যাতায়াত ভাড়া নিয়ে তাঁদের সাহায্য করেন। তবে খুবই স্বল্প সংখ্যক মানুষ এই লাইনে কাজ করার কারণে প্রয়োজনের সময় দোভাষীর সহজলভ্যতাও একটা ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়।
তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে দোভাষী বাড়ার সামজিক প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

কিভাবে শেখা যায়?
বাংলাদেশে বেশ কিছু সংস্থা আছে যারা ইশারা ভাষা শেখানোর বিভিন্ন ট্রেনিং করান। বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা, বিভিন্ন এনজিও যেমন এসডিএসএল (সোসাইটি অফ দা ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাংগুয়েজ ইউজার্স), বি-স্ক্যান এমন কয়েকটি সংস্থার কথা বলছিলেন মিঃ ইসলাম যারা বিভিন্ন মেয়াদে ইশারা ভাষা শেখান। তিনি নিজেও বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ট্রেনিং করিয়েছেন।
প্রাথমিক পর্যায়ের কথোপকথনের জন্য ৭ দিনের ওরিয়েন্টেশনের ক্লাস করান মিঃ ইসলাম। প্রাথমিক পর্যায়ে শেখার পর কেউ যদি আশেপাশের শ্রবণ প্রতিবন্ধী কারও সাথে চর্চা চালিয়ে যায় তাহলে অনেক নতুন শব্দ শিখতে পারেন। তবে পরিবার বা আশেপাশে তেমন শ্রবণ প্রতিবন্ধী কেউ না থাকলে এই ভাষায় সম্পূর্ণ পেশাদারী পর্যায়ে দক্ষ হতে তিন থেকে চার বছরও লেগে যেতে পারে, বলছিলেন মিঃ ইসলাম।
প্রয়োজন অনুযায়ী খন্ডকালীন প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করা মিজ তমা বলছেন সপ্তাহে পাঁচ দিন দুই ঘণ্টা করে ক্লাস করলে মোটামুটি তিন মাসের মধ্যে কোর্স সম্পন্ন করা যায়। যদি আগে থেকে পরিবারের কোনও সদস্যের কারণে আগে থেকে ধারনা থাকে তাহলে ১৫ দিন বা দুই মাসের কোর্সেও কাজ হয়।
তবে ইশারা ভাষা কতটা দ্রুত শেখা যায় সেটা নির্ভর করে চর্চার উপর। শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাথে চর্চা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলে একদিকে যেমন ভালোভাবে শেখা বা কম সময়ে শেখা সম্ভব হয়, অন্যদিকে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম হয়। তাই পরিবার বা আশেপাশে কেউ না থাকলে বধির ফেডারেশন বা বিভিন্ন ক্লাব যেখানে শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধীরা মিলিত হন, এমন জায়গায় গিয়ে হলেও চর্চা করার পরামর্শ দিচ্ছেন মিজ তমা।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা স্বত্বেও এক মাস চর্চার বাইরে থাকলে মিঃ ইসলাম নিজেই ভুল করার ভয় বা আত্মবিশ্বাসের কিছুটা ঘাটতি বোধ করেন, ফলে ভালভাবে শেখার জন্য নিয়মিত চর্চার বিকল্প দেখেননা তিনি।
আয় কেমন?
ইশারা ভাষায় আয়ের সুযোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এনজিওনির্ভর হওয়ায় আয়টাও ফান্ডিং-এর উপর অনেকটাই নির্ভর করে। তবে সাধারণত দক্ষ দোভাষীরা তেমন অনুষ্ঠান বা কাজের জন্য দৈনিক আট হাজার থেকে দশ হাজার টাকার মতো আয় করেন। “জুনিয়ররা হয়তো এর থেকে একটু কম পাবেন, তেমন কেউ যদি মাস শেষে হাফ ডে বা ফুল ডে মিলিয়ে ১০ টা অনুষ্ঠান করতে পারে তখন তার পক্ষে ২৫-৩০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব হবে” বলছিলেন ইসলাম। তবে সেজন্য পরিশ্রমের মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।
তবে ইশারা ভাষা জানার পাশাপাশি এসংক্রান্ত কাজ আসা অনেকটা পরিচিতির উপরেও নির্ভর করে। কাজের জন্য ডাক পেতেও ন্যুনতম তেমন সংস্থার সাথে যোগাযোগ এবং একটা পরিচয় থাকার দিকটিও গুরুত্ব দিচ্ছেন মিজ তমা। এসংক্রান্ত সংস্থা এবং মানুষজনের সাথে পরিচিতি তৈরি করতে পারলে কাজের সুযোগও বাড়বে।
নানা রকমের সচেতনতা বা ট্রেনিং সত্ত্বেও দিন দিন ইশারা ভাষায় কাজ করার মতো মানুষ কমছে। চাকরি বা নির্দিষ্ট আয়ের প্রয়োজনীয়তার সামনে অনির্দিষ্ট কাজের ডাকের আশায় বসে থাকাটা বাস্তবসম্মত হচ্ছে না অনেকের জন্য। এছাড়া আগ্রহ তৈরি হওয়ার মতো কাজও অনেক ক্ষেত্রেই কমেছে। উদাহরণস্বরূপ ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিভিশনে খবরে ইশারা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দিলেও বিটিভি এবং দেশটিভি ছাড়া কেউ সেটা করেনি। দেশ টিভির তো বন্ধ হয়েছেই, বিটিভিরও দুটি সংবাদ থেকে কমিয়ে এখন একটি করা হয়েছে।








