মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নেয়ার পদক্ষেপকে ‘আইওয়াশ’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী

বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ২০ জনের একটি দল যে মিয়ানমারে যাচ্ছে- প্রত্যাবাসনের এই প্রচেষ্টাও শেষ অবধি ‘আইওয়াশ’ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে এর আগে যত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেগুলোতে গুণগত কোন পরিবর্তন না আসার কারণে এবারের পদক্ষেপও ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. সি আর আবরার বলেন, “আমার ধারণা এটা হয়তো কিছুটা চটকদারি কিছু একটা বিষয় হতে পারে অথবা লোক দেখানো।”

মিয়ানমার এখন কেন এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, “আগে কিন্তু আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলা ছিল না। এখন মামলা আছে, যেখানে মিয়ানমারকে কিছুটা হলেও জবাবদিহি করতে হয়। এসব কিছু মিলিয়ে এটা একটা ‘আইওয়াশও’ হতে পারে, লোক দেখানো হতে পারে।”

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য এটাই প্রথম পদক্ষেপ নয়। এর আগে ২০১৮ এবং ২০১৯ সালেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো সফল হয়নি।

এর পর সম্প্রতি চীনের মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে তৃতীয় একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের ২০ জনের একটি প্রতিনিধিদলকে মিয়ানমারে পাঠানো হচ্ছে বলে জানায় শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন।

আগামী ৫ই মে তাদের যাওয়ার কথা রয়েছে।

রাখাইন রাজ্যেরে পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল কি না তা খতিয়ে দেখতে মিয়ানমারের মংডুতে তারা যাবেন বলে জানা যাচ্ছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের ২০ সদস্যের যে দলটি মিয়ানমারে যাবে তারা কারা তা এখনো ঠিক হয়নি। তাদের নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে।

“আমরা রোহিঙ্গাদেরই পাঠাবো। আমাদের কাছে যাদেরকে প্রতিনিধি মনে হবে তাদেরকেই পাঠাবো। কারণ রোহিঙ্গাদের তো এরকম কোন অর্গানাইজেশন নাই, প্রতিনিধিত্বশীল কেউ তো নাই।”

“রোহিঙ্গারা সেখানে যাবে, ভিজিট করবে, এটাই পরিকল্পনা,” বলেন মি. রহমান।

নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় মিয়ানমারে ফেরত যেতে চায় না বেশিরভাগ রোহিঙ্গা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় মিয়ানমারে ফেরত যেতে চায় না বেশিরভাগ রোহিঙ্গা

কী বলছে রোহিঙ্গারা?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বালুখালী এলাকায় ১১ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউনুস। তিনি বলেন, মিয়ানমারে ফিরে যেতে প্রস্তুত তারা। কিন্তু তার আগে তাদেরকে নাগরিকত্বের অধিকার দিতে হবে।

“আমরা যদি নাগরিকত্ব না পাই, বার বার যদি আপনাগো দেশে ফিরা আইতে পরে তাইলে কি ঠিক?”

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা মোহাম্মদ।

মি. মোহাম্মদ বলেন, তিনি, তার বাবা ও দাদা, সবাই মিয়ানমারের নাগরিক। সেখানেই ফিরে যেতে চান তারা। বাংলাদেশে নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই এসেছেন।

মিয়ানমারে যদি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় তাহলে সেখানে যেতে প্রস্তুত বলেই জানান মি. মোহাম্মদ।

“আমি তো এখনো যাইতে চাই, আমার দেশে আমি এখনো যাইবো যদি সুযোগ পাই। আমার যদি সেফটি-সিকিউরিটি থাকে সেখানে, আমি চলে যাবো।”

তবে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে যে ২০ জনের প্রতিনিধি দল মিয়ানমার যাচ্ছে তারা ফিরে যেসব তথ্য দেবেন তার উপর ভিত্তি করে মিয়ানমারে ফিরতে নারাজ মোহাম্মদ ইয়াসিন। কারণ এই প্রতিনিধিদের দেয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে তিনি সন্দিহান।

নয়াপাড়া ক্যাম্পের একজন রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী সাইফুল আরাকানী বলেন, কিছু কিছু রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যেতে চায় নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে তাদের নিজেদের বাপ-দাদার ভিটায়। কোন শরণার্থী শিবিরে ফিরতে চায় না তারা।

মি. আরাকানী বলেন, অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী মিয়ানমারের ক্যাম্পে ফেরত যেতে চায় কারণ তারা এখানে তাদের নিজেদের জীবন নিরাপদ নয় বলে মনে করে।

এবারের প্রত্যাবাসনে যারা যেতে চায় তারা প্রতিনিধিদলের ঘুরে আসার পর তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ কিভাবে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোন তথ্য জানানো হয়নি বলেও জানান মি. আরাকানী।

তিনি বলেন, “কিছু রোহিঙ্গা মিয়ানমারে এবারের রিপ্যাট্রিশনে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু তারা কিভাবে যাবে, কী নিয়ে যাবে, তাদেরকে জান্তা সরকার কী নিয়ে মিয়ানমারে ফিরাবে- তা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি। তার জন্য এরা অপেক্ষায় আছে।”

মিয়ানমারে নির্যাতন থেকে বাঁচতে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মিয়ানমারে নির্যাতন থেকে বাঁচতে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে

কতটা সফল হবে এই উদ্যোগ?

বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোয় সব মিলিয়ে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল, যার মধ্যস্থতা করেছিল চীন।

এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের ১৫ই নভেম্বরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটিকে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সেটি আর বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি।

এরপর ২০১৯ সালে অগাস্টে চীনের তরফ থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর আরেকটি উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু নাগরিকত্বের বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় যেতে চায়নি।

এরপর গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তালিকা যাচাই-বাছাই করতে মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের কক্সবাজারে আসে।

এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখ চীনের মধ্যস্থতায় সেদেশের কুনমিংয়ে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের ত্রিপাক্ষিক একটি বৈঠক হয়। এর অংশ হিসেবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তৃতীয় এই উদ্যোগ আসে।

আসিফ মুনীর বলেন, এর আগে যেহেতু বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হতে হতেও হয়নি, তাই এই পদক্ষেপও বাস্তবায়ন হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

তিনি বলেন, এর আগে দুই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে রাজি হওয়ার কথা জানা গেলেও রোহিঙ্গাদের সাথে তেমন কোন আলাপ-আলোচনা হয়নি। এবারও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

“বর্তমানে যে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে সেটা শুধুই প্রশাসনিক। কাজেই এটা সার্থকতা আনবে বলে আমাদের মনে হয় না।”

মিয়ানমার এমন একটা সময়ে প্রত্যাবাসনের এই প্রচেষ্টা শুরু করেছে, যার কিছুদিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে তাদের জবাব দিতে হবে।

মি. মুনীর বলেন, মিয়ানমারে এর আগে গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেও বর্তমানে সেখানে সামরিক সরকার রয়েছে। ফলে তাদের একটা গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করার জায়গা থাকতে পারে। এর অংশ হিসেবে এই সময়ে এসে এমন পদক্ষেপের তোড়জোড় আসতে পারে।

একই মত দিয়েছেন শরণার্থী বিষয়ক আরেক বিশেষজ্ঞ ড. সি আর আবরার। তিনি বলেন, “ এটা লোক দেখানো যে, আমরা (মিয়ানমার) করছি, এগুচ্ছে, একটা অজুহাত হিসেবে পরবর্তীকালে যে, ওদের (রোহিঙ্গাদের) সাথে আমরা বৈঠক করছি, তারা এসছে, তারা দেখে গেছে, মূলত কালক্ষেপন ছাড়া এখানে আর কোন কিছু দেখছি না আমি।”

উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্প ও ভাসানচরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্প ও ভাসানচরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আছেন

তিনি বলেন, বাংলাদেশ যে মিয়ানমারের সাথে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল সেখানে চীনের ভূমিকা ছিল। এর পরে অনেক দিন চলে গেছে। কিন্তু এখনো কোন রোহিঙ্গা সেখানে যেতে পারেনি এবং সেই পরিস্থিতির কোন গুণগত পরিবর্তন আসেনি।

“সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমি খুব একটা মনে করি না যে, এই ধরনের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অদূর ভবিষ্যতে হবে।”

তবে কিছুটা ভিন্ন মত দিয়েছেন সাবেক কুটনীতিক হুমায়ুন কবীর। তিনি বলছেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে যে পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা মিয়ানমার যাচ্ছে তা কিছুটা আশার সঞ্চার করছে।

আশাবাদ হচ্ছে যে, রোহিঙ্গারা যদি নিজেরা গিয়ে দেখে আসে এবং তারা যদি সন্তুষ্ট হয় তাহলে হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে পাইলট প্রকল্পের আওতায় নেয়ার জন্য আস্থার জায়গা তৈরি হতে পারে। তবে সব কিছু যদি ইতিবাচক থাকে, শুধু তাহলেই আশা তৈরি হবে।

অন্যদিকে এনিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে যার উত্তর মিলছে না বলেও মনে করেন হুমায়ুন কবীর।

তিনি বলেন, এই প্রকল্প কি শুধু এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই হচ্ছে না কি এর ধারাবাহিকতা থাকা দরকার যার আওতায় ধীরে ধীরে সবাই যেতে পারবে- সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।

দ্বিতীয়ত, যে ২০ জন রোহিঙ্গা যাচ্ছে তাদের উপর ভরসা করে ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা যাবে কি না সেটি পরিষ্কার নয় এবং এর উত্তরও নেই।

তৃতীয়ত, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরার পর সেখানে তারা টিকতে পারবে কি না সেটাও একটা প্রশ্ন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৃতীয়পক্ষের উপস্থিতির দরকার হবে। সেক্ষেত্রে তৃতীয়পক্ষের ভূমিকা কী হবে অর্থাৎ জাতিসংঘ, আসিয়ান বা বাংলাদেশের বন্ধু কোন রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুষ্পষ্ট কোন বক্তব্য এখনো শোনা যায়নি।

তিনি বলেন, “তারা বলেননি যে, রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিতে তারা ভূমিকা রাখবেন।”

একই সাথে বাংলাদেশের সতর্ক থাকার সুযোগ আছে বলেও মনে করেন সাবেক এই কুটনীতিক।

তিনি বলেন, “এটা দেখিয়ে যদি মিয়ানমার সারা পৃথিবীতে বলে বেড়ায় যে, এর সমাধান আমরা করে ফেলেছি, তাহলে তো আমাদের কাজ হলো না। আমরা চাই ১১শ না, যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা আছে তাদের সবার প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা হোক।”