নির্বাচন কমিশন কেন আবার সংলাপের জন্য বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে?

বাংলাদেশে নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ বেড়েই চলেছে। (ফাইল ফটো)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ বেড়েই চলেছে। (ফাইল ফটো)
    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন নিয়ে সংলাপ করার জন্য নির্বাচন কমিশন দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে আবারো আমন্ত্রণ জানিয়েছে ।

প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির পক্ষ থেকে এই আমন্ত্রণকে ‘সরকারের নতুন কৌশল’ বলে বর্ণনা করেছে দলটি, কিন্তু এখনো সংলাপে যাওয়া না যাওয়ার বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানায়নি।

মঙ্গলবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা রয়েছে।

এই বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া সেই নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি ঘোষণা দিয়েছে।

এর আগে কমিশন যে সংলাপের আয়োজন করেছিল, সেখানে অংশ নেয়নি দেশের অন্যতম প্রধান এই রাজনৈতিক দল এবং তাদের মিত্র দলগুলো।

সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য কূটনৈতিক মহল থেকে বারবার তাগিদ দেয়া হচ্ছে।

এমন প্রেক্ষাপটেই বিএনপিকে সংলাপে বসার জন্য পুনরায় আমন্ত্রণ জানালো কমিশন।

এই আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে এমন সময়ে, যখন বহু বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর বিএনপি এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে।

অতীতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নানারকম বাধা তৈরি করা হত। কিন্তু এবার দেশে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করার জন্য তাদের ছাড় দেয়া হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

আরও পড়তে পারেন:

নির্বাচন কমিশনের ডাক

গত বছরের জুন মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সংলাপের আয়োজন করেছিল নির্বাচন কমিশন। তাতে অংশ নেয়নি বিএনপি এবং তাদের মিত্র দলগুলো। তাহলে আবার কেন তাদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে?

‘’আমরা তো চিঠিতেই উল্লেখ করেছি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে আলাপ আলোচনার জন্য তাদের ডেকেছি,'' বিবিসি বাংলাকে বলেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান।

''এটাই উদ্দেশ্য, অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। প্রত্যেককে ডেকে কথা শুনতে চাই, নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কাজ করতে চাই,‘’ তিনি বলেন।

মি. রহমান বলেন, বিএনপিকে আগেও ডাকা হয়েছিল, তারা আসেন নি। ভবিষ্যতেও তাদের ডাকা হতে পারে। ''আমাদের আহ্বান অব্যাহত থাকবে,‘’ বলছেন মি. রহমান।

কমিশন জানিয়েছেন, প্রয়োজনে আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য দলগুলোকে নিয়েও আবারো সংলাপের আয়োজনের কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে তিনি এটিও বলছেন, ‘’অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তো আমরা বসেও থাকতে পারবো না। আমাদের সময় দিনদিন কমে যাচ্ছে। ‘’

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি।

সংলাপের আড়ালে সরকার?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

নির্বাচন কমিশন আমন্ত্রণ জানালেও, দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন এর পেছনে সরকারের ইঙ্গিত থাকতে পারে। তারা মনে করছেন, নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের 'ডেভেলপমেন্ট পার্টনার', অর্থাৎ পশ্চিমা দেশগুলোর একটি উদ্যোগ থাকায়, সরকার চাপের মধ্যে আছে।

''একটা প্রেশার সরকারের ওপরে কাজ করছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে নির্বাচন কমিশনের এই আমন্ত্রণের পেছনে সরকারের একটা ইঙ্গিত থাকতে পারে,‘’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন।

''আমার মনে হয় না যে, হঠাৎ শুধু নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগের কারণেই এটা হয়েছে,'' তিনি বলেন।

অধ্যাপক আহমদের মতে, নির্বাচন কমিশনই যেহেতু বারবার বলেছে নির্বাচন কোন্ পদ্ধতিতে হবে, সেটা একটা রাজনৈতিক প্রশ্ন, তাহলে বিএনপির সঙ্গে কমিশনের কী আলোচনা হবে?

‘’আমার মনে হয় যে, এটার পেছনে সরকারের একটা পরোক্ষ ভূমিকা থাকতে পারে, যাতে নির্বাচন ইস্যুতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে একটা আলোচনা শুরু হয়,‘’ তিনি বলছেন।

তিনি মনে করেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় কমিশনের পক্ষে কোনরকম মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেয়া সম্ভব নয়। তবে সরকারি এবং বিরোধী দলের যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে, সেখানে হয়তো আলোচনার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে।

সংলাপে নিয়ে বিএনপির অনীহা

নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণের ব্যাপারে সোমবার পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিএনপি। মঙ্গলবার দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণের ব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘’নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণের আগে পর্যন্ত আমরা তো সবসময়েই আমাদের অবস্থান খুব ক্লিয়ার ভাবে জানিয়ে আসছি। আমরা নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধীনে ছাড়া কোন নির্বাচনে যাবো না। সরকারের বাইরে গিয়ে তো নির্বাচন কমিশন কিছু করতে পারবে না।‘’

একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপ বা আলোচনায় তো নিজেদের দাবি দাওয়া তুলে ধরতে পারে বিএনপি। তাহলে সংলাপ নিয়ে কেন তারা সন্দেহের চোখে দেখছেন?

এই প্রশ্নের জবাবে মি. ইসলাম বলেন, তাদের দাবি একটাই, আর সেটা হল নিরপেক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, কোন দলের অধীনে নির্বাচনে তারা যাবেন না।

''সেই সমাধান তো এই কমিশন দিতে পারবে না, তাহলে তাদের সাথে সংলাপ করে কী লাভ হবে?’’ মি. ইসলাম বলেন।

পার্লামেন্ট ভবন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে

বিএনপিতে মতভেদ

বিএনপির নেতারা মনে করছেন, সামনের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে। তাই কৌশলে বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসার ব্যাপারে আলোচনা করতে চায় কমিশন। কিন্তু তাতে কতটা কাজ হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে দলটির মধ্যে।

বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংলাপে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে বিএনপির ভেতরে নানারকম মতভেদ রয়েছে।

বিএনপির নেতারা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে বিএনপির দাবিদাওয়ার বিষয়ে কোন সমাধান হবে না। কিন্তু তখন সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, বরং বিএনপি রাজি হয়নি, এমনটা সরকার কূটনৈতিকদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারে।