‘আসামে শাকসবজির আগুন দামের জন্যও মিঁয়া মুসলিমরাই দায়ী’

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে আরও একবার চরম সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করে তরিতরকারি বা ফলমূলের অগ্নিমূল্যের জন্য ‘মিঁয়া মুসলিম’দের দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা।
রাজধানী গুয়াহাটিতে সবজির দাম কেন আকাশ ছুঁয়েছে? সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কারা এই তরিতরকারির দাম বাড়িয়েছে সেটা তো দেখুন! এরা সবাই হল মিঁয়া সবজিওয়ালা, যারা এত বেশি বেশি দাম নিচ্ছে।”
আসামের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়কে বোঝাতেই এই ‘মিঁয়া’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
এফআইআর দায়ের
‘মিঁয়া’-দের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে দুটি এফআইআর দায়ের হয়েছে।
একটি এফআইআর দায়ের করেছেন আসাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অজিত কুমার ভুঁইয়া আর অন্য এফআইআর জমা দিয়েছে ‘অসম সংখ্যালঘু সংগ্রাম পরিষদ’।
রাজধানী দিসপুরে দায়ের করা এফআইআর-এ মি. ভুঁইয়া জানিয়েছেন যে মুখ্যমন্ত্রীর “এধরনের মন্তব্য রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করবে” এবং “এধরনের মন্তব্য করার উদ্দেশ্যই হল ধর্ম আর জাতির ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা তৈরি করা।“
রাজ্যসভার সদস্য মি. ভুঁইয়া এফআইআর-এ এটাও উল্লেখ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি সব রাজ্যের পুলিশ মহা নির্দেশকদের নির্দেশ দিয়েছে যে ঘৃণা-ভাষণের কথা জানতে পারলেই পুলিশকে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত করতে হবে।
“ঘৃণা ভাষণ বন্ধ করার জন্য সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দেওয়ার পরেও আসামের মুখ্যমন্ত্রী একটা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে এধরণের মন্তব্য করেছেন। আমার মনে হয়েছে এটার প্রতিবাদ হওয়া দরকার। জানি না পুলিশ আদৌ কোনও ব্যবস্থা নেবে কী না, কারণ আমার অভিযোগটা তো খোদ মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে, তবে প্রতিবাদ জানিয়ে রাখলাম,” বিবিসি বাংলাকে বলেন অজিত ভুঁইয়া।
যদিও ‘মিঁয়া’ শব্দটি বেশ অবমাননামূচক অর্থেই প্রয়োগ করা হয়ে থাকে, তবে রাজ্যের বাঙালি মুসলিমরা কিন্তু ইদানীং নিজেদের পরিচয় ব্যক্ত করতে তাদের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেই এই শব্দটিকে গ্রহণ করে নিয়েছেন।
গত কয়েক বছরের মধ্যে সে কারণেই আসামের বাঙালি মুসলিমরা ‘মিঁয়াকাব্য’ নাম দিয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছেন, এমন কী তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরতে একটি ‘মিঁয়া মিউজিয়াম’ খোলারও চেষ্টা হয়েছে।
কিন্তু আসামে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার যে এই ‘মিঁয়া’দের আসামের অংশ হিসেবে মনে করে না, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সেটা বারে বারেই বুঝিয়ে দিয়েছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
তরিতরকারির দাম নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য এই তালিকাতেই সবশেষ সংযোজন। বিবিসি হিন্দি বিভাগই মুখ্যমন্ত্রীর এই বিতর্কিত মন্তব্য সর্বপ্রথম রিপোর্ট করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী সে দিন আরও দাবি করেছেন, গুয়াহাটিতে সব্জিওলারা ‘মিঁয়া’ বলেই তারা অসমিয়াদের কাছ থেকে এত বেশি দাম নিচ্ছেন – অসমিয়ারাও যদি সব্জি বেচতেন তাহলে কখনোই এত দাম নিতেন না।
ঠিক কী বলেছেন হিমন্ত?
দিন কয়েক আগে অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের নেতা ও ধুবড়ি থেকে নির্বাচিত লোকসভা এমপি বদরুদ্দিন আজমল বলেছিলেন, “মিঁয়া সম্প্রদায়কে ছাড়া আসাম অসম্পূর্ণ।”
সংবাদমাধ্যমের কাছে সেই প্রসঙ্গ টেনে এনে আসামের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই ধরনের মন্তব্য করে বদরুদ্দিন আজমল আসলে অসমিয়া সম্প্রদায়কেই অপমান করেছেন।”
বস্তুত মিঁয়া মুসলিমদের তিনি যে আসামের অংশ বলেই মনে করেন না, সেটা বোঝাতে হিমন্ত বিশ্বশর্মা কোনও রাখঢাকই করেননি।

এরপরই যখন তাঁর কাছে তরিতরকারির অগ্নিমূল্য নিয়ে জানতে চাওয়া হয়, তিনি সরাসরি তার দায় চাপিয়ে দেন ‘মিঁয়া’ সব্জিওলাদের ওপর। বলেন, এই মিঁয়া মুসলিমরাই আসলে বেশি বেশি দাম নিচ্ছেন।
“গ্রামের দিকে কিন্তু তরিতরকারির দাম বেশ কম। অথচ গুয়াহাটিতে এই মিঁয়ারা অসমিয়াদের কাছ থেকে চড়া দাম হাঁকছেন। আজ যদি অসমিয়ারা সব্জি বেচতেন, তাহলে কিন্তু সহ-নাগরিক অসমিয়াদের কাছ থেকে কখনোই বেশি দাম নিতেন না”, বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
গুয়াহাটি শহরে বিভিন্ন ফ্লাইওভারের নিচে অস্থায়ী সব দোকান থেকে মিঁয়া-রা যে সব্জি ও ফলমূল বেচেন, তিনি নিজে তদারকি করে সেগুলোর উচ্ছেদের ব্যবস্থা করবেন বলেও জানান হিমন্ত বিশ্বশর্মা।
তিনি বলেন, “এতে করে আমাদের ‘অসমিয়া ছেলে’দের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।”
গত মাসে বকরি ঈদের সময় গুয়াহাটিতে গণপরিবহন ব্যবস্থা যে ভেঙে পড়েছিল, তার জন্যও তিনি মুসলিম গাড়ি-চালকদের দায়ী করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি বলেন, “আমরা সবাই দেখেছি ঈদের সময় গুয়াহাটিতে বাস চলাচল কীভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় ভিড়ভাট্টাও একদম ছিল না।”
এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আশি শতাংশ বাস-চালক ও সত্তর শতাংশ উবার-ওলার মতো ক্যাব ড্রাইভাররা সবাই ‘মিঁয়া’ বলেই ওই অবস্থা হয়েছিল।
মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দেন, সরকার চায় ‘অসমিয়া যুবক’রাই এই ধরনের কাজে আরও বেশি করে এগিয়ে আসুক – যাতে মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবের সময় রাজধানী আবার অচল না-হয়ে পড়ে।
ওয়াইসি, আজমলের প্রতিবাদ
হিমন্ত বিশ্বশর্মার ওই বিতর্কিত মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় মুসলিম রাজনীতিবিদরা – তাঁরা অভিযোগ করছেন মুখ্যমন্ত্রী আসলে আসামে বিভাজনের রাজনীতি করছেন।
হায়দ্রাবাদের এমপি তথা এআইএমআইএম নেতা আসাদউদ্দিন ওয়াইসি টুইট করেছেন, “ভারতে একদল লোক আছেন যারা তাদের বাড়িতে মোষ দুধ না-দিলে বা মুরগি ডিম না-পাড়লেও মিঁয়াদের দায়ী করে থাকেন।”
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post
সেই সঙ্গেই মিশরে বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাম্প্রতিক সফরের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, “আজকাল তো মোদীজির সঙ্গে বিদেশি মুসলিমদের খুব দোস্তি, তো ওদেরকেই বলুন না টমেটো, আলু, পালংশাক পাঠাতে!”
এআইইউডিএফ নেতা বদরুদ্দিন আজমল আবার প্রশ্ন তুলেছেন, “মুখ্যমন্ত্রী গুয়াহাটিকে মিঁয়া-মুক্ত করার কথা বলছেন, ওখানে তাদের শাকসব্জি বেচতে দেবেন না বলে ঘোষণা করছেন। একটি রাজ্য সরকারের প্রধান কীভাবে এ ধরনের কথা বলতে পারেন?”
মুখ্যমন্ত্রীর এই ‘বিভেদমূলক বক্তব্যে’র কারণে যদি ‘অসমিয়া ভাই’ আর মুসলিমদের মধ্যে ‘কোনও ঘটনা ঘটে যায়’, তাহলে হিমন্ত বিশ্বশর্মাই সরাসরি তার জন্য দায়ী থাকবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন মি আজমল।
শাকসব্জির দাম মিঁয়ারা বাড়াননি বলেও দাবি করেন তিনি। সেই সঙ্গেই বলেন, “অসমিয়া যুবকরা এই পেশায় আসুক, এটা তো খুব ভাল প্রস্তাব।”
“কিন্তু তারা কি চাষবাস করতে পারবে? যে ধরনের কঠিন পরিশ্রম এতে লাগে, আমার তো মনে হয় না অসমিয়ারা তা পারবে বলে!”, মন্তব্য করেন বদরুদ্দিন আজমল।

ছবির উৎস, Getty Images
বরপেটার কংগ্রেস এমপি আবদুল খালেকও এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আসামে সাম্প্রতিক ও জাতিগত দাঙ্গা বাঁধানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী নিজেই আসলে ক্রমাগত উসকানি দিয়ে চলেছেন!”
মিঁয়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিমন্ত বিশ্বশর্মার এ ধরনের প্রকাশ্য আক্রমণ অবশ্য কোনও নতুন ঘটনা নয়।
গত বছর রাজ্যের গোয়ালপাড়া জেলায় মিঁয়াদের একটি নিজস্ব সংগ্রহশালা উদ্বোধনের দুদিনের ভেতরেই আসাম সরকার সেটি সিল করে দেয় এবং তার প্রধান উদ্যোক্তা, অল আসাম মিঁয়া পরিষদের প্রেসিডেন্ট মোহর আলিকে গ্রেপ্তার করে।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা তখন বলেছিলেন, “চাষের লাঙলকে কীভাবে মিঁয়ারা নিজেদের আইডেন্টিটি হিসেবে দাবি করতে পারে? এক লুঙ্গি ছাড়া আর কোনওটাই তাদের নিজেদের জিনিস নয়!”








