প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি: সরকারির চেয়ে বেসরকারি চাকরিতে বৈষম্য কেন?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, তানহা তাসনিম
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
বেসরকারি খাতের প্রভিডেন্ট ফান্ডের আয়ের ওপর সাড়ে ২৭ শতাংশ কর্পোরেট কর আরোপ করার নতুন নিয়ম নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সম্প্রতি কয়েকটি সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেসরকারি খাতের প্রভিডেন্ট ফান্ডের মুনাফার ওপর এই কর আরোপ করেছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তরফ থেকে কোন বক্তব্য বা ব্যাখা পাওয়া যায়নি।
সরকারি চাকুরীজীবীদের বাদ দিয়ে কেবল বেসরকারি খাতের প্রফিডেন্ট ফান্ডের মুনাফার ওপর এই নিয়ম আরোপ করাকে 'বৈষম্যমূলক' হিসেবে বর্ণনা করছেন অনেকে।
শুধু প্রভিডেন্ট ফান্ড নয়, কয়েক বছর আগে বেসরকারি চাকুরীজীদের গ্র্যাচুইটি ফান্ড নিবন্ধনের আওতায় নিসে আসে। সেখানে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের গ্র্যাচুইটি ফান্ড নিবন্ধিত না হলে কর্মীদের কাছ থেকে ট্যাক্সের টাকা কেটে নেয়া হবে। অথচ ফান্ড নিবন্ধন করার জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। সেটি না করে পুরো বিষয়টি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে কর্মীদের উপর।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নতুন করে প্রফিডেন্ট ফান্ডের আয়ের ওপর উচ্চহারে কর ধার্য করায় আয় যেমন কমে যাবে, তেমনি বেসরকারি চাকরি করা ব্যক্তিদের ওপরও এর প্রভাব পড়বে।

ছবির উৎস, Getty Images
'এক দেশে দুই আইন'
২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি কোন খাতের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডকে আয়কর দিতে হতো না।
২০১৬ সালের পর থেকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের মুনাফার ওপর উৎসে কর হিসেবে ৫ থেকে ১০ শতাংশ কর কেটে রাখা হতো।
সম্প্রতি অনুমোদিত আয়কর আইন ২০২৩-এ প্রভিডেন্ট ফান্ডের ওপর কর আরোপের নতুন বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী এই অর্থবছর থেকেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রফিডেন্ট ফান্ড থেকে অর্জিত আয়ের ওপর কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
একই সঙ্গে প্রফিডেন্ট ফান্ডের অর্থ কোথাও বিনিয়োগ করা হলে ওই আয়ের ওপর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
এই সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে করছেন বেসরকারি খাতের চাকুরীজীবী ও খাত-সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বলেন, ‘আমি এটার কোন যৌক্তিকতাই খুঁজে পাইনি’।
এছাড়াও সরকারি চাকুরীজীবীদের বাদ দিয়ে কেবল বেসরকারি চাকুরীজীবীদের জন্য এটি কার্যকর করা ‘ভারসাম্যপূর্ণ হয়নি’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
“জীবনযাত্রার ব্যয় তো সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য যা, বেসরকারিদের জন্যও তা। মাংস, সবজি– সবতো একই দামে কিনতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে (নতুন আইনকে) সরকারি চাকুরীজীবীদের সঙ্গে তুলনা করলে মনে হবে এক দেশে, দুই আইন”।
সরকারি ও বেসরকারি চাকুরীজীবীদের ক্ষেত্রে দ্বৈতনীতিকে ‘বৈষম্যমূলক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ।
তিনি বলেন, এনবিআর থেকে আরও ব্যাখ্যার দরকার আছে। কেননা আগে যেখানে সর্বোচ্চ কর ১০ শতাংশ ছিল সেটাকে কোন যুক্তিতে বা কোন হিসেবে সাড়ে ২৭ শতাংশ করলো, এটা তাদের ব্যাখ্যা করতে হবে, ব্যাখ্যা করা উচিৎ হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
প্রফিডেন্ট ফান্ড কী?
কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সময় ব্যক্তির আয় থেকে প্রতি মাসে মূল বেতনের সাত থেকে ১০ শতাংশ কেটে একটি তহবিলে রাখা হয়। একই পরিমাণ অর্থ প্রতিষ্ঠানও ওই তহবিলে জমা রাখে।
এর মাধ্যমে যে অর্থ জমা হয় তা কর্মী চাকরি শেষে পান। টাকা জমা রাখা এই তহবিলকেই বলা হয় প্রফিডেন্ট ফান্ড।
এছাড়াও একটি নির্দিষ্ট সময় পর চাকরি ছেড়ে দিলে বা অবসরে গেলে ব্যক্তি এককালীন একটি অর্থ পায়, একে বলা গ্র্যাচুইটি। গ্র্যাচুইটি ফান্ডের পুরো টাকা প্রতিষ্ঠান কর্মীকে দেয়। কোন ব্যক্তি চাকরি ছাড়লে কিংবা অবসরে গেলে তিনি যত বছর কাজ করেছেন তত মাসের মূল বেতন পাবেন।
সরকারি চাকরিতে প্রফিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা থাকলেও সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তা থাকে না। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান আইন মেনে চলে তারা কর্মীদের জন্য এই সুবিধা রাখে।
যেহেতু বেসরকারি চাকরিজীবীরা সরকারি চাকরিজীবীদের মতো কোনো পেনশন পান না, চাকুরীজীবন শেষে এই অর্থ তাদের জন্য অনেকটাই সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
প্রফিডেন্ট ফান্ডের অর্থ ফেলে না রেখে লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা হয়, যাতে করে প্রফিডেন্ট ফান্ডের আয় বাড়ে।
আগে কী ছিল?
১৯৮৪ সালে প্রণীত আয়কর অধ্যাদেশে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক ছিল না। সেই তালিকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রফিডেন্ট ফান্ড ও গ্রাচুইটিরও উল্লেখ ছিল।
গত ২২ জুন পাস হওয়া নতুন আয়কর আইন- ২০২৩-এর ধারা ১৬৬(২)-এ দেয়া তালিকা থেকে বেসরকারি প্রফিডেন্ট ফান্ড ও গ্রাচুইটিকে বাদ দেয়া হয়েছে।
একই আইনের ধারা ২(২২) এ দেয়া সংজ্ঞা অনুসারে, তহবিলসমূহকে ‘করদাতা’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
ফলে এখন এই তহবিলসমূহের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক এবং নিয়ম অনুযায়ী এই কর হবে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

ছবির উৎস, Getty Images
কর আরোপের প্রভাব কী?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকুরীজীবীরা যেমন চাকরীর মেয়াদ শেষে পেনশন পান, বেসরকারি চাকুরীজীবীরা তা পান না।
ফলে অবসরে যাওয়ার পর প্রফিডেন্ট ফান্ডের টাকা তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মিস্টার মজিদ বলেন, প্রফিডেন্ট ফান্ড এমন একটা বিষয় যা মানুষকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করে। সবাই যেন তহবিলের নিয়ম কানুন মেনে চলে তাই এই তহবিলের আইন কানুনও এনবিআর থেকে ভ্যাটিং করে নিতে হয়।
এই ফান্ডগুলো এক ধরণের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করে। এগুলোর ওপর কোনো কর আরোপ করা হলে স্বাভাবিকভাবেই অবসরকালীন সুবিধা কমে যাবে।
প্রফিডেন্ট ফান্ডের ওপর কর আরোপের কারণে এর সুবিধাভোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আর এটিকেই করারোপের সবচেয়ে বড় প্রভাব হিসেবে দেখছেন মিস্টার হক।
তিনি বলেন, অবসরে যাবার পর প্রফিডেন্ট ফান্ডের টাকাটা অনেকের জন্যই খুব জরুরি। অনেকে হয়তো কেবল এই টাকার ওপরই নির্ভর করে”।
সেক্ষেত্রে ফান্ডের টাকা কমে গেলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব তাদের ওপরই পড়বে।
এছাড়াও প্রফিডেন্ট ফান্ডের অর্থের ওপর উচ্চহারে করারোপ করলে প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবার সম্ভাবনা আছে।
সেক্ষেত্রে প্রফিডেন্ট ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে।
পেনশন স্কিমে টেনে আনার কৌশল?
সম্প্রতি সব স্তরের মানুষকে পেনশনের আওটায় আনার জন্য সার্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে সরকার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বেসরকারি কর্মকর্তা বলেন, সার্বজনীন পেনশন স্কিমে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় বেসরকারি প্রফিডেন্ট ফান্ডকে নিরুৎসাহিত করার জন্যই হয়তো এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
কেননা প্রফিডেন্ট ফান্ডে যদি এত বড় অঙ্কের অর্থ কর হিসেবে কেটে নেয়া হয়, তাহলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা।
সেক্ষেত্রে নিরাপত্তার কথা ভেবে হলেও অনেকে পেনশন স্কিমে যোগ দেবেন।
কেন কর বাড়ানো হলো?
আয় বাড়ানোর জন্যই এই ধরনের একটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক সালমা বেগম।
তিনি বলেন, সরকার এমন এক জায়গায় এসেছে যেখানে কর আদায় বাড়াতে হবে।
উন্নত বিশ্ব ছাড়াও বাংলাদেশের প্রতিবেশে দেশের আয়েরও বড় একটি উৎস আয়কর। কিন্তু বাংলাদেশে সেই দৃশ্য অনেকটাই ভিন্ন।
দেশটির আয়ের বড় একটি উৎসই আসে শুল্ক ও ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর থেকে, যেটার ভারও সাধারণ মানুষরাই বহন করে।
আবার এখন যখন নতুন করে আয়কর থেকে বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে সেটার চাপও পড়ছে জনসাধারণের ওপরই।
“একজন চাকুরীজীবীর আয়ের অন্তত ১০ শতাংশ কর দিতে হয়। অন্যদিকে তার আয়ের থেকে প্রফিডেন্ট ফান্ডে যে সঞ্চয় হচ্ছে সেটার থেকেও যদি ৩০ শতাংশ কেটে নেয়া হয়, তাহলে আয়ের বড় একটি অংশই তাকে কর দিতে হচ্ছে।
মিজ সালমা বেগমের মতে, আয় বাড়ানোর ভিন্ন দিকগুলো সরকার এড়িয়ে গেছে।
এর বদলে যারা কর ফাঁকি দেন, তাদের করের আওতায় আনটাই কাম্য ছিল বলে মনে করেন তিনি।








