‘পাকিস্তানী ভাবিকে’ জেরা করেছে ভারতের সন্ত্রাস দমন ইউনিট

ছবির উৎস, ANI
পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে আসা আলোচিত সীমা হায়দারকে মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা জেরা করেছে উত্তরপ্রদেশের সন্ত্রাস দমন ইউনিট। এছাড়া তার ভারতীয় স্বামী এবং শ্বশুরকেও জেরা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার গভীর রাতে তাদের একটি 'সেফ হাউস'-এ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।এর আগে অবৈধভাবে ভারতের প্রবেশের দায়ে পুলিশ তাকে এবং তার ভারতীয় স্বামী সচিন মীনাকে গ্রেপ্তার করেছিল। যদিও পরে আদালত তাদের জামিন দেয়।
সোমবার তাদেরকে তুলে নিয়ে যায় উত্তরপ্রদেশের সন্ত্রাস দমন ইউনিট। প্রায় ঘন্টা ছয়েক জেরা করার পরে মঙ্গলবার সকালে আবারও মিজ হায়দার, মি. মীনা এবং তার বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যান সন্ত্রাস দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা।
তার সঙ্গে পাকিস্তানী গুপ্তচর বাহিনীর কোনও যোগাযোগ আছে কী না, সেটা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানাচ্ছে গোয়েন্দা সূত্র।
মিজ হায়দারের পাকিস্তানী পরিচয়পত্র সেদেশে ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে বলেও জানা যাচ্ছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Getty Images
পাবজি খেলতে গিয়ে প্রেম ও বিয়ে
সন্ত্রাস দমন ইউনিটের এক কর্মকর্তা সংবাদসংস্থা পিটিআইকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, তবে তিনি এটাও জানিয়েছেন যে সীমা হায়দারকে হেফাজতে নেওয়া হয়নি।
পাকিস্তানে থাকার সময়েই মোবাইলে পাবজি খেলতে গিয়ে দিল্লী লাগোয়া নয়ডার বাসিন্দা সচিন মীনার সঙ্গে আলাপ জয় বিবাহিত সীমা হায়দারের। সেই পরিচিতি গড়ায় প্রেমে, শেষ পর্যন্ত মি. মীনাকে বিয়ে করার জন্য নেপাল হয়ে ভারতে চলে আসেন মিজ. হায়দার। চার সন্তানকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন তিনি। সীমার পাকিস্তানী স্বামী বর্তমানে সৌদি আরবে থাকেন।
মিজ. হায়দার বিবিসিকে জানিয়েছিলেন যে তারা নেপালে বিয়ে করেছেন এবং তিনি ধর্ম পরিবর্তন করে হিন্দু হয়ে গেছেন। তিনি গুপ্তচর কী না এ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ার পর থেকে বারেবারেই মিজ হায়দার সেই অভিযোগ অসত্য বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এটাও বলেছেন যে একমাত্র সচিন মীনার প্রেমের টানেই তার ভারতে চলে আসা।
তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করছেন, সীমা হায়দারের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি পাচ্ছেন তারা, তাই সন্দেহ বাড়ছে।

ছবির উৎস, Getty Images
কী প্রশ্ন করা হচ্ছে?
গোয়েন্দা সূত্র উদ্ধৃত করে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে প্রথম দিন সীমা হায়দারকে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে, তার মধ্যে করাচী থেকে দুবাই যাওয়া আর সেখান থেকে নেপালে আসা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করা হয়েছে তাকে।
সেখানে কাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি, কারা তার ভ্রমণের নথিপত্র বানিয়ে দিল, কোন নম্বর থেকে তিনি পাবজি গেমের একাউন্ট খুলেছিলেন, মাত্র পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে তিনি কী করে ভাল হিন্দি আর ইংরেজি বলেন, এসব তথ্যই জানতে চাওয়া হয়েছে তার কাছে।
এছাড়াও তার পরিবারের কেউ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে কর্মরত কী না, তাও জানতে চাওয়া হয় মিজ হায়দারের কাছে।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post
সংবাদ সংস্থা এএনআই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রগুলি উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে যে সীমা হায়দারের ব্যাপারে সশস্ত্র সীমা বল বা এসএসবি এবং উত্তরপ্রদেশ পুলিশের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে।
সশস্ত্র সীমা বল ভারতের একটি আধাসামরিক বাহিনী, যারা নেপাল-ভারত এবং ভারত-ভূটান সীমান্তে নজরদারির কাজ চালায়।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, কীভাবে একজন পাকিস্তানী নাগরিক ভারত-নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে চলে এল, পুলিশ কেন ধরতে পারল না আর দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে এরকম একজন নারী উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এলাকায় বসবাস করছেন, সব তথ্যই জানতে চাওয়া হয়েছে এসএসবি এবং উত্তরপ্রদেশ পুলিশের কাছে।
নেপাল আর ভারতের মধ্যে চলাচল করতে ওই দুই দেশের নাগরিকদের কোনও পাসপোর্ট বা ভিসা লাগে না। কিন্তু সীমা হায়দার একজন পাকিস্তানী নাগরিক হয়ে কী করে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশে এলেন, প্রশ্ন উঠছে তা নিয়েই।

ছবির উৎস, Getty Images
যেভাবে করাচী থেকে ভারতে
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সীমা হায়দার নিজে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, যে তিনি এক ট্র্যাভেল এজেন্টের মাধ্যমে প্রথমে করাচী থেকে দুবাই যান, সেখান থেকে নেপাল হয়ে ভারতে পৌঁছন।
“পাবজি খেলতে খেলতেই বন্ধুত্ব হয় আমাদের। তারপরে কথাবার্তা শুরু হয়। সারাদিন, সারারাতও কথা হত আমাদের। তারপরে আমি ঠিক করি যে ভারতে চলে আসব। কিছু ইউটিউব ভিডিও দেখে আমি বোঝার চেষ্টা করি যে কীভাবে ভারতে আসা যেতে পারে। সেই অনুযায়ী এক ট্র্যাভেল এজেন্টের মাধ্যেম দুবাই, সেখান থেকে নেপালে আসি। সেখানেই বিয়ে হয় আমাদের। তারপর বাসে করে ভারতে আসি,” জানিয়েছেন সীমা হায়দার।
তিনি এও দাবী করেছিলেন যে তার পাকিস্তানী স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। তবে মিজ হায়দারের স্বামী গুলাম হায়দার বিবিসিকে জানিয়েছিলেন যে মিজ. হায়দার অসত্য বলছেন, তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয় নি।
তার কথায়, “ঈদের পরে বাচ্চারা আমার কাছে আসতে চেয়েছিল, তাই আমি তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বানিয়ে দিই অনলাইনে আবেদন করে। আমার যদি বিবাহ বিচ্ছেদই হয়ে গিয়ে থাকবে, তাহলে কেন আমি ২০২৩ সালে ওদের হয়ে পরিচয়পত্রের আবেদন করতে যাব?”
মি. হায়দার চাইলেও তার পরিবার অবশ্য চায় না যে মিজ হায়দার পাকিস্তানে ফিরে আসুন।
কিন্তু মিজ হায়দার বিবিসিকে বলেছেন, “আমি নিজের গলা কেটে ফেলব, বিষ খাব। কিন্তু আমি ফিরে যাব না।“
অন্যদিকে সীমা হায়দারকে ভারত থেকে ফিরিয়ে না দেওয়া হলে হিন্দুদের ওপরে হামলা হবে, এরকম একটা হুমকি দেওয়ার পরে সিন্ধ প্রদেশের একটি হিন্দু মন্দিরে রকেট হামলা হয়েছে গত রবিবার বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা পিটিআই।

ছবির উৎস, Getty Images
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
যেভাবে ধরা পড়েন সীমা হায়দার
সীমা হায়দার আর সাচিন মীনার ঘটনাটি জানাজানি হয় এক আইনজীবির মাধ্যেম।
টাইমস অফ ইণ্ডিয়ার ওই আইনজীবিকে উদ্ধৃত করে এক প্রতিবেদনে লিখেছিল যে কীভাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়া যেতে পারে, সে ব্যাপারে আইনী পরামর্শ নিতে মিজ. হায়দার এবং মি. মীনা তার কাছে গিয়েছিলেন।
ওই আইনজীবি জানিয়েছেন, “ওই নারীর কাছে পাকিস্তানের পরিচয়পত্র আছে দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে জানান যে তার স্বামী তার ওপরে অত্যাচার করতেন আর বছর চারেক তার স্বামীর সঙ্গে দেখাও হয় নি। তারা এও জানতে চাইছিলেন যে ভারতে কীভাবে বিয়ে করা যেতে পারে।“
“আমি মিজ হায়দারের কাছে ভারতের ভিসা দেখতে চাই। তখনই তিনি বেরিয়ে যান। আমিই পুলিশকে খবর দিয়েছিলাম এঁদের ব্যাপারে,” জানিয়েছিলেন ওই আইনজীবি।
এরপরেই প্রথমবার সীমা হায়দার, সাচিন মীনা আর তার বাবাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।








